রবিবার দুপুর ২:৫২, ২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ. ৩রা মার্চ, ২০২৪ ইং

‘তাজ’, আমার অসুস্থ মনের কল্পনা

৪৬৯ বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

আজ বরং তাজের কথা বলি| তাজ নামের মাঝে সূক্ষ্ম একটা পুরুষালী গন্ধ থাকলেও পুরোদস্তুরে কামিনী নারী সে|  তার প্রসঙ্গ তুলতে গেলে প্রথম যে কথাটা বলতে হয়, সে আমার গোছানো জীবনটা এলোমেলো করে দিয়েছিলো| তরুণ বয়স তখন আমার| বিদেশের বাড়িতে কাজের ফাঁকে আড্ডা দেই খাই ঘুরি, মাঝে মাঝে লং ড্রাইভে যায় দল বেঁধে|

দুবাই মিলিটারি হাসপাতালে কেটারিংয়ে তার সাথে আমার পরিচয়| আমি কাজ করতাম হাসপাতালে ভিতরে ফুলের দোকানে। তাজ ছিল কেটারিং সুপার ভাইজার| তাজের বয়স ঐসময় বড়জোর বিশ আর আমার বাইশ|  আমার সেলারী সর্বসাকুল্যে চারশো ডলার ওর বেসিক সেলারী ছিল বারশো ডলার|  কেটারিংয়ে ঢোকার অনুমতি ছিল না আমার। কিন্তু মালিক কর্নেল হওয়ার সুবাধে সুযোগ বুঝে ডিউটিকালীন খাবারটা অনুমতি ছাড়াই অফিসার কেন্টিনে বসে খেয়ে আসতাম|  মৃদু কথাকাকাটিই তাজের সঙ্গে আমার প্রথম কথোপকথন|

পুরা দুবাই মদ নিষিদ্ব মুসলমানের জন্য|  অফিসার কেন্টিনে কার্টুন ভর্তি রাজ্যের নামীদামী মদ বিদেশী ষ্টাফদের জন্য| আমি মদ আগে কখনো খাইনি তবে দামী হুইস্কি যে ফল দিয়ে বানাই তা জানতাম| ওর সাথে দেখা হয় প্রতিদিনই কিন্তু আমি ইংরেজিতে পারদর্শী কম হওয়াতে হাই-হ্যালোতে সীমাবদ্ধ|

হঠাৎ একদিন তাজ আমাকে হাসপাতালের বাইরে সিকো বিল্ডিং দেখা করতে বলে|  অনেকটা বিস্ময়ের সঙ্গে আশ্চর্য্য হয়| তাজ অনর্গল ইংরেজিতে কথা বলে|  আমি ইংরেজিতে, কাঁচা ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজি বলি|  বিকেলে সিকো মার্কেটে যাই অনেকটা ভয়ে ভয়ে|  মার্কেটের দোতলার কার্নিশে দাড়িয়ে হাত দিয়ে মুচকি হেসে উপরে যাওয়ার জন্য ইশারা করে| ঐ বয়সে মেয়ে পটানোর কলা কৌশল জানতাম না|  প্রেশার বেড়ে যায় আমার|

সন্ধ্যে অবধি বসে ছিলাম মার্কেটের দুতলার রেস্তোরাঁর|  সৌহার্দ্যপূর্ণও আন্তরিক ব্যবহারের ফলে ভেতরের রক্তক্ষরণ কমে আসছিল অনেকটা| ভালোবাসাময় চোখাচোখি উপভোগ করছিলাম|  অদ্ভুত এক কামনার চোখে ঈশ্বরী আমার দিকে তাকিয়ে ছিল |  বিষণ্ণ বিদায়ী সন্ধ্যায় চলে যাওয়ার সময় আমার হাতে উপঢৌকন হিসেবে ব্যগ গুঁজে দিয়ে যায়| হঠাত করে ও যখন আমায় হাত ধরল বয়ে গেলো চোরা স্রোত শিরদাড়া বেয়ে কেঁপে  উঠলো শরীর, তিন দিন পর্যন্ত বা-হাতটা অবশ ছিল এ কেমন স্পর্শ? ট্যাক্সি উঠে গিফটের ব্যাগে হাত দিলাম এক লিটার পানির বোতলে দামী হুইস্কি আর একটা সনি ওয়াকম্যানের পেকেট| কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙা শুরু করলো ভোরবেলায়|

বাসায় ঢুকেই স্নায়ুকে নিয়ন্ত্রণে আনবার জন্য গ্লাসভর্তি মদ ঢেলে একটু একটু করে খাওয়া শুরু করি|  জীবনে এই প্রথম অ্যালকোহল স্পর্শ| একটানা দেড় বছর পানির চেয়ে  বেশি মদ গিলেছি ওর দয়ায়| তাজ, সে অ্যালকোহল ঠোঁটে ছোঁয়াবেনা এটা তার প্রতিজ্ঞা| পরের  ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটে যায়| আমার স্থির জীবনের উঠানে চড়ুই পাখির আনাগোনা শুরু হলো| স্বামী স্ত্রী পরিচয়ে আলাদা বাসায় উঠি, সিকো মার্কেটে চোখাচোখি উপভোগের পনের দিনের মধ্যে|  বাসাভাড়া, ফার্নিচার ওঅন্যান্য আনুষঙ্গিক পুরো খরচটায় তাজের টাকায়| অজানা এক গোপন সমঝোতায় একে অপরের হাত ধরাধরি করে থাকি|

কয়েকটা দিন রূপকথার চাদরে মুড়ি দিয়ে কাটলো| প্রণয়ের শুরুর দিকে  তাজের চুমুতে ঘুম ভাঙে| আমি বিভ্রান্ত চোখে তাকিয়ে থাকি। বারবার মনে হয় দৃষ্টিভ্রম। আমার মতো এমন ভাসমান কচুরিপানার জিবনে ঈশ্বরীর আনাগোনা কেন হবে? মায়া মায়া চোখ, বসন্তের শেষ বিকেলের মতো হাসি। এ তো দেখতে সাক্ষাত ঈশ্বরী! আমাকে নাকি আবার ভালোও বাসে!

বিছানা ছাড়তে দেরি করায় সে আমাকে চোখ রাঙ্গায়| সে  সুযোগ পেলেই আমাকে কামুক, অলস পুরুষ বলে রাগানোর চেষ্টা করে| আমি নাকি আদরের ফন্দিফিকির ছাড়া কিচ্ছু বুঝি না| না জানিয়ে ফুড়ুৎ করে ফিলিপাইন চলে গেলে বুঝবে, কতো ধানে কতো চাল! শুনে আমার মেরুদন্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়| নিজেকে তাড়াহুড়ো হাতে ভদ্রস্ত করে ওকে চুমুতে এলোমেলো করে দিয়ে ঘর ছেড়ে অফিসের দিকে পা বাড়ায়|

অপরাধবোধের চেয়ে বেশি পরিতৃপ্তি লেপ্টে থাকে আমাদের চোখেমুখে|  বাড়াবাড়ি রকম নির্লজ্জপনা করি আমরা দুজন| ওকে দেখে,ওর সাথে মিশে মনে হলো এই বিদেশীনিকে না পেলে জীবন আমার পুরোটাই বৃথা ! তাকে আদরে চুমু খেয়ে বলি,সবসময় এমন থাকবে তো? সে মুখ মোচড় দেয়| আমাকে বলে, ন্যাকা | অপ্রত্যাশিত খুশিতে আমি শিষ বাজাতে থাকি|  সপ্তাহে ছয়দিনই সে পানির বোতলে দামী হুইস্কি আনত আমার জন্য| মদ ও নারীর নেশাই একেবারে চুড় হয়ে সুখের ভেলায় ভাসছি, আমার চোখে পৃথিবীর অন্য মানুষগুলি মূল্যহীন|  ওর নাভির সভ্গে কে যেন আমায় বেধে রেখেছে | সে আমার কোলে বসে থাকতে শান্তি পেতো| মাতাল অবস্থায় নারীর সভ্গ আরো মধুর-রোমাঞ্চকর নিজেকে দুবাইয়ের ক্রাউন প্রিন্স মনে হতো|

সেছিল জোড়া ভুরু অধিকারিনী টেনিস তারকা রুপসী আন্না কুরনিকোভার মতো দেখতে|  হাসিটা তার চেয়েও সুন্দর| জিন্সের প্যান্ট,গোল গলা গেন্জি,পুলিশ ব্যান্ডের সানগ্লাস ওয়াটারপ্রুফ কেডস,ও পায়ে সোনার নুপুরের রিনিঝিনি শব্দ তুলে হাটত|  এই হচ্ছে আমার তাজ|  মমতা দিয়ে আগাগোড়া ঢাকা পড়া একজন ক্যাথলিক খ্রিস্টান ফিলিপিনো  তরুনী|  আমি খুব জানি,আমায় কি পরিমাণ ভালোবাসে সে|  গভীর রাতে আমি ঘুমিয়ে গেলে একমনে তাকিয়ে থাকে|  আমার  মুখে কি যেন খোঁজে|  আমার শ্যাম্পু করা চুল একমনে তার আঙ্গুলে পেঁচাতে থাকে| মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াতো শিশুর মত|  আমার বুকটা ছিল ওর স্টেশন ওখান থেকে মুখটা সরাতে তাজের কষ্ট হত|  শেষজীবনে একসাথে উড়াবার আহ্লাদী প্রহসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম| পুরুষের স্বভাবজাত হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছি| বুঁদ হয়ে আছি নেশা, আদরে, আর ভালোবাসায়| সেও মায়াবতী| পুঙ্খানুপুঙ্খ খেয়াল রাখে আমার|  কখন ওষুধ খেতে হবে,কখন চুমু খেতে হবে,সব|

অদ্ভুত মিষ্টি এক গন্ধ আসতো ওর শরীর থেকে| ওর সাথে লিভটুগেদারে আছি দেড়বছর ধরে|  সে আমাকে বিয়ে-টিয়ে করে একাকার করে ফেলতে চেয়েছিলো|  ওর ধর্মে আমাকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ|  আমার ধর্মে ওকে|  ওপ্রথা ভাঙতে চেয়েছিলো|  আমার পাখির মতো মন|  বনে বাদাড়ের মতো পথেঘাটে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস|  আমার সংসার করার কোন ইচ্ছেই ছিলনা|  আই লাভ ইউ শব্দটা আমরা খই মত ব্যবহার করতাম|  দেখা হলেই আই লাভ ইউ বলে অন্য টপিকে পা বাড়াতাম|

আমাকে ওর স্বামী বলে পরিচয় দিতো ওর দেশী-পরিচিত কাছের মানুষের কাছে| আমি নিবাক ছিলাম| বিয়ে না করে ওর সাথে থাকছি শুনে ওর মা ফিলিপিন থেকে চিঠি দিলো কড়া ভাষায়| ওর মাতো আর জানে না, তাজ যে আমার জীবন আলো করে আছে| ও প্রতি উত্তরে মাকে লিখলো কাগজের সই একটা সময় করে দুজন মিলে দিয়ে দেবো না হয়| তাই নিয়ে অমন পাড়া মাথায় তোলার কি আছে! আমার নাম রফিক ফরাজী | তাজ আমাকে লফিক ফলাজী ডাকত|  তাজ ‘র’ উচ্চারণকে ‘ল’ বলত|

ও ড্রেসিং টেবিলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়| আমি পূর্ণ দৃষ্টিতে ঈশ্বরীকে তাকিয়ে দেখি| ওকে লাগছিলো স্বর্গ থেকে ভুল করে নেমে এসেছে পরীর মতো|  সৃষ্টিকর্তা তাকে সুন্দর একটা শরীর দিয়েছে|  উষ্ণ নগ্ন শরীর আরো কাছে এনে বলে,পূজো করো| কষে কষে ঠোঁটে চুমু খেতাম অনেকক্ষণ ধরে| নাভীটা ছিল অসাধারন সুন্দর পদ্ম নাভি | অফিস গিয়েও মন সর্বক্ষণ পড়ে থাকে ওর কাছে| কখন বাসায় ফিরবো-তাজ কথন ডিউটি থেকে ফিরবে| সে আমার চুলে বিলি কেটে দিতো| ওয়াশরুম থেকে বের হলে সে তোয়ালে দিয়ে আমার চুল মুছিয়ে দিত|  আমারও অদ্ভুত মায়া লাগতে থাকে তার জন্য|

ছুটির পুরো দিনটা বিজাতীয় দুটো নষ্টা নিষিদ্ধ অবাধ যৌনাচারে নির্লিপ্ত| বিছানার আমাকে কোল বালিসের মত জড়িয়ে ওশুতো সবসময়|  সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থায় ঘুমাতাম বুকে বুক চেপে| সদ্য জন্মানো শঙ্খচিলটার মতো ভিন্ন ভিন্ন ভাষার অভিন্ন দেশের মানব মানবীর একটা নতুন সংসার একটু একটু করে ডালপালা মেলতে থাকে নিজের মতো করে অচেনা ধমীর্য় রক্ষণশীলদের দেশে|

জীবন রঙ্গময়| ভালোই তো কাটছিলো সব|  চুকচুক করে মদ খাবার কারণে সমস্ত দিনই একটা আমেজের মাঝে থাকা হয় ফলে অলস হয়ে গিয়েছিলাম|  লিভ-টুগেদারের বছর ঘুরার আগেই ডিউটি ফাঁকিবাজির জন্য চাকুরীটা হাত ছাড়া হয়|  খুব দ্রুতই মুটিয়ে গেলাম|  পয়ষটি কেজির হ্যাংলা পাতলা রফিক বছর ঘুরতেই একলাফে নব্বই কেজি| আমার ও আর ভালো লাগছিল না ওর রক্ত জল করা টাকায় ফূর্তি করতে| প্রতিদিনই ভাবি মদটা ছেড়ে দেবো, ভাবতে ভাবতে  একটার পর একটা চুমুক দেই মদের গ্লাসে। হাপিয়ে উঠছিলাম চালচুলোহীন অন্ধকার ভবিষ্যতহীন বন্য ও নিকৃষ্ট জীবনাচরণে|  অতিরিক্ত মদ খাওয়ার কারণে শরীরটা আর আগের মতো সায় দিচ্ছিলোনা|  এর মাঝে  অ্যালকোহলজনিত কারনে ভয়াবহ প্রসাব ইনফেকশ আমার কাল হলো| তাজকে ঘুণাক্ষরেও বলিনি অ্যালকোহল জনিত কারনে আমি অসুস্থ|সিদ্বান্ত নিলাম ধুঁকে ধুঁকে মরবার চেয়ে দেশে ফিরব|  বাড়ি নেশা হাতছানি দিয়ে টানছে মৃত্যুর জোয়ারে|  আমার কাছে ঐমুহুর্তে নারী চেয়ে বোতলের নেশা আসক্তি অনেক বেশি মুল্যেবান ছিল|

তাকে বললাম আমি অসুস্থ দেশ ফিরব, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে  ছিল সন্ধ্যা অব্দি একটা কথাও বলিনি আমার সাথে| একেবারেই খাওয়া দাওয়া বন্ধ ,সাড়া-শব্দ নাই|  মাঝে মাঝে দেখতাম মেয়েটা জানালা্র সামনে দাঁড়িয়ে আছে ,গালে হাত দিয়ে|  প্রেমিক তো,ঠিক বুঝতে পারি, তার চোখদুটো ভেজা|তাজ আমার সামনে কাঁদে না। তবু প্রতিবার কাছে এলে দেখি, চোখ লাল করে এসেছে| তাজের চোখের জল বেখেয়ালে মুখে লেগে থাকে। আমি সেই জল হাত দিয়ে গভীর আবেগে স্পর্শ করি|

আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদত, সবচেয়ে প্রিয় খেলনাটা ভেঙে ফেলেছে শিশুর মতো|  তাজ ওর নিজের টাকায় বিমানের টিকিট পছন্দমতো কাপড় চোপড় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র লাগেজ ভরে দিয়েছিল অকৃত্রিম বর্ণনাহীন ভালোবাসায়|  তার অকৃত্রিম পরিপূর্ন ভালবাসার বিপরীতে আমি তাকে শূন্য পৃথিবীতে একা ছেড়ে দিয়ে এসেছি|  অদৃশ্য কারণে আর দেখা হয়নি হবেও না এজনমে|  কিছু রক্তক্ষরণের রঙ দেখা যায়না|  কিছু রক্তক্ষরণের কথা কাউকে বলা যায়না|  সৃষ্টিকর্তার বিধানের বাইরে গড়া অবৈধ সুখের সংসার বেশি দিন থাকেনা | বিজাতীয় জারজ কিছু কষ্টের অনুভূতি চেপে রাখবার জন্যই গুটিকয়েক মানুষ এই পৃথিবীতে জন্মেছে|  প্রাসঙ্গিক যন্ত্রণায় বুকের ভেতরে টনটনে একধরণের ব্যাথা হতে থাকে আমার|  বুকে চাপ চাপ কষ্ট হতে থাকে আমার| সত্যি আমি জনম জনমের ক্ষেত, নিষিদ্ধ এক নাগরিক|  ধন্যবাদ ৷

Some text

ক্যাটাগরি: খবর, গল্প, চিন্তা, ছড়া, নাগরিক সাংবাদিকতা

[sharethis-inline-buttons]

Leave a Reply

আমি প্রবাসী অ্যাপস দিয়ে ভ্যাকসিন…

লঞ্চে যৌন হয়রানি