সোমবার সন্ধ্যা ৬:০৯, ২১শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ. ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ ইং

কে লিখবে উপজেলা সাংবাদিকদের দুঃখগাঁথা?

৪৬৭ বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

মা বললেন ছেলেকে, কিরে খোকা, এবারে পুজায় আমাকে শাড়ি কিনে দিবে তো? সারাদিন ক্যামেরা আর একটা মাইক্রোফোন নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘুরে বেড়াস। রাতে ফিরে আমাকে তো টাকা দিস না, বৌমাকে টাকা রাখতে দিস তো? সামনে পুজা, কিছুই যে বলিস না। বুঝতে পারছি না।

ছে‌লে: কি করবো বল মা, এটা যে আমার কর্তব্য। সময়মতো খবর প্রকাশ না করতে পারলে চলবে কি করে? আমরা যে এ কাজের জন্য সামান্য কিছু বেতন পাই, আবার কেউ পায় না মা। আর তুমি পুজায় শাড়ি চাচ্ছো, তাতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। শুনছিলাম মা, এবার নাকি সাংবাদিকরা করোনার কারণে প্রণোদনা পাবে। আমিও পাবো মনে করেছিলাম। আর সে টাকা দিয়ে তোমাকে ভাল একটা শাড়ি কিনে দিব। কিন্তু সে টাকা আর আমি পেলাম না। কারণ হয়ে দাঁড়ালো, আমি যে “উপজেলার”? আর কেবা লিখবে আমাদের এ দুঃখ দুর্দশার গল্প মা?

স্ত্রী বল‌লো, রাখো তোমার এসব কথা আগের রাতে নিউজ কভার করতে গিয়ে সারারাত ফিরলে না, ফোনটাও তোমার বন্ধ। তোমার চিন্তায় সারারাত আমি না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমাদের অপেক্ষার বেতন কত পেলাম তাহলে? বেবীটাও সারারাত বাবা বাবা বলে কাঁদছিল, পাবেই বা কত বেতন?

বললাম, শোন, আমরা রিপোর্টার। এটা নিয়ে ঠিকমতো অনেক অভিজ্ঞতার ব্যাপার। বুক ফুলিয়ে বলতে তো পারো যে তোমার স্বামী একজন সাংবাদিক। আরো দশটা পেশার মত আমাদেরটাও দেশের জন্য খুবই দরকার।আমরা খবর সংগ্রহ করে প্রিন্ট ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশ করি বলেই তো তোমরা ঘরে বসে সব কিছু জানতে পারো। এখান থেকে অনেক দূরের এখন কি হচ্ছে।

মা বল‌লেন, না রে বাবা, সেদিন তোর ছেলেকে নিয়ে বাজারে গিয়েছিলাম। নতুন জামার জন্য খুব বায়না ধরেছে। আর তুমি যে টাকা দাও তাতে তো জামা কিনে দিলে এ মাস লবনণ দিয়ে খেয়ে থাকতে হবে। তাই আমি কোনোমতে বুজিয়ে নিয়ে আসছি। তারপর তুমি সারাদিন না খেয়ে থাকলে আমি দুশ্চিন্তায় থাকি এই বুঝি তোর একটা কিছু হয়ে গেল। এর আগের বছর কি একটা ঝামেলায় জড়িয়ে পায়ের একটা চোট নিয়ে বাড়ি ফিরলি। এই রক্তের দাম কি কেউ তোমাকে দিয়েছে?

ছেলে: এত চিন্তা করো না মা। তুমি আর তোমার নাতি এরকম করলে তোমার বৌমা তো ছেলেমানুষি করবেই। ওদেরকে তো তুমি ভরসা দিবে মা। আচ্ছা ঠিক আছে। সাবধানে থেকো মা। এখন যে করোনার উপদ্রব, তাতে বাড়ি থেকে একদম বেরিও না। এখন আমি আসি মা। এই, তোমরা খেয়ে নিও।

ব্যাগটা কাধে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় তিন বছরের ছেলেটা হাতের আঙ্গুল ধরে বলল, আমার জন্য কি আনবে বাবা, আর কখন ফিরবে তুমি? জানো বাবা, তোমার যখন আসতে দেরি হয় তখন মা আর দিদি খুব চিন্তা করে। আচ্ছা বাবা, খুব তাড়াতাড়ি আসবো। এখন আসি।

একথা বলে সাংবা‌দিক বেরিয়ে গেল। এরপর শুরু হলো জেলার সাংবাদিকদের মত উপজেলার সাংবাদিকদের পাঠকের খবর জোগাড়ের সূচনা। এভাবেই প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের সাথে ওদের দেখা হয়। কতশত খবর সংগ্রহ ক‌রে নিয়ে আসেন তারা। আজ কে খুন হলো, কে মাঝ রাস্তায় পড়ে মারা গেল, কার নামের পাশে উপাধি যুক্ত হল, কোন শিশুটা রাস্তার পাশে জলসায় থেকে উদ্ধার হল। এতসব খবর ওরা আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরে। আবার খবর মন মত না হলে শুনতে হয় অফিস থেকে নানা কথা। তখনো হায়ার লেভেল থেকে শুনতে হয় অনেক কথা। কিছু ভুল খবর প্রকাশিত হলে জনগণের রেশে পড়তে হয় সাংবাদিকদের।

খড়া, বন্যা, বজ্রপাতে ওদের থামতে মানা, কারণ ওরা থেমে গেলে দেশ থেমে যাবে। সাধারণ মানুষকে সচেতন করবে কে? কখন কোথাও বিশাল কোন জনসভাতে উপরতলার মানুষের সামান্য কথা তুলে ধরবার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা রোদে পুড়তে হয় তাদের।তবুও হয়তো অনেক সময় দেখা মিলে না উপরতলার লোকদের সাথে। আসলে ওদের নিজেদের কাজটাই ওরকম। সবার জন্য সমানভাবে খবর দেয়ার চেষ্টা করলেও সামান্যতম ভুলভ্রান্তিতে ওদের নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়। সঠিক খবর সঠিক সময় পৌঁছে দেয়ার জন্য বনে জঙ্গলে বাজারে শহরে নদীতে যেখানে সেখানে বিধি নিষেধ শর্তেও ওদের চলতে হয়।

দুই পক্ষের মাঝখানেও কখনো কখনো মাথা ফাটিয়ে আসতে হয় তাদের। সাংবাদিক প্রতিনিয়ত হাসপাতাল চত্বরে গিয়ে আপডেট জোগাড় করেন, আমাদের জন্য আজ কতজন করোনায় পেশেন্ট বাড়লো, আমরা বাড়িতে বসে সব পেয়ে যাই। তার জন্য ওরা প্রাণপরণ লড়াই করে। ওরা মৃত্যু জানের পিছু পিছু ছুটতে থাকে শেষ দৃশ্যটা কাভার দেওয়ার জন্য। ওরা সাংবাদিক, রোবট না। কিন্তু তার পরেও ওদের নিয়ে মজা করে এবং ওদেরকে নিয়ে অনেকে হাসেন মজা করেন।

একবার ওদের জায়গায় নিজেকে বসিয়ে দেখুন, ওদের জীবনের মূল্য কত টাকা। কত টাকার বিনিময় নির্ধারণ করা হচ্ছে ওরা নিজেও জানে না। আজ বেরিয়ে গেলেও আগামী কাল আদৌ ফিরবে কিনা, আপনার বাড়ীর ছেলেরা যতটা ইনভাইট গাল করে ওরাও কিন্তু ততটাই পরিশ্রম করছে ওই জায়গায় দাঁড় করার জন্য ওদেরকে অনেক খরকুঠো কুড়াতে হয়েছে সাংবাদিকের শুধু বেতন ভক্ত কর্মচারী না ভেবে দেখুন ওদের কাজকে একটু সম্মান দিন।

ওরা পেটের দায়ে এসব কাজ করছে তা নয়। অনেক সাংবাদিক বেতন পর্যন্ত পায় না। ওদের এটা একটা ভালোবাসার জায়গা। অনেক পরিশ্রম করে তবেই এই জায়গা অর্জন করেছে। আমরা তো বাড়িতে বসে এসব খবর দেখি। আর ওরা মৌমাছির মতো খবর সংগ্রহ করে আনে।

করোনাকালীন প্রেরণা প্র‌ণোদনা,

উপজেলা সংবাদকর্মীরা পেল না।

গৌতম চন্দ্র বর্মন: ঠাকুরগাঁও থেকে

Some text

ক্যাটাগরি: খবর

[sharethis-inline-buttons]

Leave a Reply

আমি প্রবাসী অ্যাপস দিয়ে ভ্যাকসিন…

লঞ্চে যৌন হয়রানি