সোমবার রাত ২:০৭, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ. ২৩শে জুন, ২০২৪ ইং

মুসা স্যার: একজন বড় মনের মানুষ (পর্ব-০৩)

৫১৩ বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

সদ্যপ্রয়াত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খ্যাতিমান ব্যক্তি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া গবেষক, ভাষা সৈনিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, সাদা মনের মানুষ মুহম্মদ মুসা স্যারকে নিয়ে লিখতে লিখতে ভাবছিলাম কাজটি আমি ঠিক করছি কি না। কারণ জ্ঞানে, গুণে ও মানে মুহম্মদ মুসা স্যার আমাদের কাছে সমুদ্রসম। যে সমুদ্রের আমি জেলে, মাঝি বা নাবিক নই, সে সমুদ্রের গতীপ্রকৃতি, সভাব বা গভীরতা সম্পর্কে আমি কিইবা লিখতে পারব আর কতটুক লিখতে পারব। অর্থাৎ যে মুসা স্যার সম্পর্কে আমি তেমন কিছুই জানিনা, যার সোনালী দিনের কর্মকান্ড গুলি আমি কাছ থেকে দেখব দূরের কথা সে সময় আমার জন্মই হয়নি, সেই ব্যক্তিকে নিয়ে লিখা কতটা যৌক্তিক বা বোধ সম্পন্ন কাজ ।

পরে ভাবলাম আমি নাইবা হলাম ঐ সমুদ্রের জেলে, মাঝি বা নাবিক। একজন ভ্রমণ পিয়াসু দর্শক হিসেবে নিজের দেখা অভিজ্ঞতা বর্ণনাতো করা যেতেই পারে। একজন সাধারণ পর্যটক যেমন সমুদ্রের গভীরতা মাপতে পারে না, তেমনি মুসা স্যারকে নিয়ে লিখে আমি তাঁর যোগ্যতা বা গুণের সামান্যতম অংশও তুলে ধরতে পারবো না। আমি শুধু সে অংশটুকুই লিখতে চাচ্ছি তাঁর যতটুক স্মৃতি আমার কাছে আছে। অর্থৎ আমার এই লেখা শুধুই স্মৃতিচারণ মূলক, কারো কোন মূল্যায়ন নয়।

পড়ুন ১ম পর্ব- বৃহৎ মানুষের সঙ্গে ক্ষুদ্রস্মৃতি

২০০৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি, মহান শহীদ দিবস। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ও সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনায় শহীদ দিবস উদযাপন করা হবে। আমরা তখন দ্বিতীয় বর্ষে।আমরা মানবিক শাখার কয়েকজন বন্ধু সিধান্ত নিলাম শহীদ দিবস উপলক্ষে আমরা একটা দেয়ালিকা প্রকাশ করব। বিষয়টি আমাদের শ্রেনী শিক্ষক জনাব নজরুল ইসলাম স্যারকে জানানো হলে স্যার আমাদেরকে উৎসাহ দিলেন। জনাব সেলিনা ম্যাডাম, জনাব নুরে আলম সিদ্দিকি স্যার এবং জনাব নজরুল ইসলাম স্যারের তত্ত্বাবধানে আমাদের দেয়ালিকার প্রকাশের কার্যক্রম শুরু হলো।

স্যারদের নির্দেশে দেয়ালিকার জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে লেখা সংগ্রহের জন্য কলেজের নোটিশ বোর্ডে এর পাশে হাতে লিখা বিজ্ঞাপন লাগানো হলো, একাদশ শ্রেনীর প্রথমবর্ষ আর দ্বিতীয়বর্ষের প্রত্যেক শাখায় ঘোষণা দিয়ে আসা হলো। লেখা সংগ্রহ হলে নজরুল স্যার সেগুলি বাছাই করলেন। বন্ধু শামিম রেজার পীরবাড়ির বাসায় আমি, শামিম রেজা, মাহদুমুল হক, ওয়ালিউল্লাহ মাহমুদ, রিফাত বিন আইয়ুব সহ আরো কয়েকজন বন্ধু মিলে রাত জেগে জেগে দেয়ালিকার কাজ করা হলো।

২০০৭-এ লেখক ও তার বন্ধুদের আয়োজিত ‘স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠানে’ বক্তব্য রাখছেন ভাষাসৈনিক মুহম্মদ মুসা

দেয়ালিকায় একটি লেখার জন্য আমরা মুসা স্যারের কাছেও আবদার করে ছিলাম। স্যার তখন বললেন দেয়ালিকার জায়গা ছোট, আমাদের লেখা নিয়ে জায়গা নষ্ট না করে ছাত্র-ছাত্রীদের দু-একটা লেখা বেশি নাও। আমরা বললাম ঠিক আছে স্যার, তাহলে একটা বানী দিয়েন। সেই দেয়ালিকায় অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষ স্যারের বাণীর সাথে ভাষা সৈনিক মুসা স্যারেরও একটি বানী নেয়া হয়েছিলো।

২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহরের আগেই দেয়ালিকাটি শহীদ মিনারের কাছা-কাছি স্থানে রেখে দেয়া হয়েছিলো। আর সেই দেয়ালিকা শহীদ মিনারে আসা আগত দর্শনার্থী, ছাত্র-ছাত্রীরা ও শিক্ষক বৃন্দ যারা দেখতে এসে ছিলেন তাদের মধ্যে মুসা স্যারও ছিলেন।সবাই দেয়ালিকার প্রসংশা করছিলেন। অনেই বলাবলি করছেন যে বহু বছর পর কলেজে এটা দেয়ালিকা প্রকাশ করা হলো।

আজ আমরা সেই সকল বন্ধুরা সারাজীবন এটা গর্ব করে বলতে পারিযে, কোন এক শহীদ দিবসে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আমাদের ক্ষুদ্র একটি সৃষ্টিশীল কাজে একজন ভাষা সৈনিক আমাদের পাশে ছিলেন। যা আমাদের কাছে চির গৌরবের। এর কয়েক মাস পর আমরা আরেকটি দেয়ালিকা তৈরী করেছিলাম দুটি দেয়ালিকাই প্রদর্শন শেষে কলেজের লাইব্রেরী রুমে রাখা হয়েছিলো।লাইব্রেরী রুমটি যথন আধুনিকায়ন করা হলো তখন দেয়ালিকা দুটি কোথায় রাখা হয়েছে আমাদের আর জানা নেই।

এর পরের মাস আমরা বিশ্ব সাহিত্যর বন্ধু মাহমুদ, রিফাত, হৃদয়, পাপেল, সাব্বির, সোহলে, সনি, তানজিনা, তন্বী, লিটাসহ আরো কয়েকজন মিলে সিধান্ত নিলাম কলেজে স্বাধিনতা দিবস উদযাপন করব। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রর সংগঠক ও আমাদের শ্রেনী শিক্ষক জনাব ওসমান গণী সজিব স্যারকে জানানো হলো।কিন্তু স্যার আমাদের এই বলে সতর্ক করলেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল। সব ধরনের সভা, সমাবেশ,গণ-জমায়েত নিষিদ্ধ। এ অবস্থায় আমরা তোমাদের অনুষ্ঠান করার অনুমতি দিতে পারি না। কিন্তু তবুও আমরা সীমিত আকারে দিবসটি উদযাপন করতে চাইলাম। স্যার তখন বলেন ঠিক আছে তোমরা এল.টি রুমে অনুষ্ঠান না করে, শিক্ষক কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠান কর।আর আমি তোমাদের সরাসরি সহযোগিতা না করতে পারলেও পিছন থেকে সহযোগিতা করব।

২০১০ সালে ‘কবির কলম’ আয়োজিত স্মৃতিসৌধে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন মুহম্মদ মুসা, মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ ও অন্যান্যরা

কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি থাকবেনা বলে আমরা কোন আর্থিক সহযোগিতাও পাবোনা। আমরা বন্ধুরা নিজেরা চাঁদা দিলাম এবং কলেজের বিভিন্ন বন্ধুদের কাছ থেকে দশ টাকা, বিশ টাকা করে চাঁদা উঠিয়ে সেই স্বাধিনতা দিবস অনুষ্ঠান আয়োজন করলাম। জনাব সজিব স্যারের নির্দেশনায় অনুষ্ঠানে তৎকালিন বিদায়ী প্রফেসর আবদুন নূর স্যার ও উপাধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা স্যারের সাথে মুহম্মদ মুসা স্যারও অতিথি হয়ে এসেছিলেন। সেদিন মুসা স্যার মন্ত্রমুগ্ধর মত বক্তৃতা করেছিলেন। আর নূর স্যার দিয়েছিলেন তেজদীপ্ত ভাষণ। সেদিন তাঁরা সকলেই আমাদেরকে বিরুপ পরিস্থিতেও ভালোকাজ করার জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন।

সে সময়ের আরেকটি ঘটনা, একদিন সন্ধ্যায় ফারুকী পার্কের পাবলিক লাইব্রেরিতে পত্রিকা পড়তে গিয়েছি। সেখানে মুসা স্যারও কি কাজে গিয়েছেন। সম্ভবত কোন বই খুঁজছিলেন। স্যারকে সালাম দিতেই বলেন তুমি কি এখানে বই পড়তে এসেছো। আমি বললাম স্যার, মাঝে মাঝে পত্রিকা আর ম্যাগাজিন গুলি পড়িতে আসি। স্যার বললেন বই পড়ো না? আমি বললাম সব বই সেলফে তালা দেয়া থাকে। ওনাদের সাথে পরিচয় নাই, তাই বই পড়া হয়না। তিনি বললেন এই কারণে তুমি বই পড়ো না! পত্রিকা পড়তে হবে, বইও পড়তে হবে। আমি বললাম স্যার এখানে বই না পড়লেও কাজিপাড়ার লাইব্রেরীতে বই পড়ি। (কাজীপাড়া-প্রয়াত ডাক্তার রফিকুল ইসলাম চেম্বারের দোতলায় সরকারি গণগ্রন্থাগার ছিলো, যেটা এখন কুমারশীল মোড়) তখন স্যার বললেন চল তোমাকে পরিচয় করিযে দেই, তিনি আমাকে সেখানের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুজন লোকের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তারপর থেকে সেখানেও মাঝে মাঝে বই পড়তে যেতাম।

পড়ুন ২য় পর্ব: আমাদের মুসা স্যার

ছোট বেলায় আব্বার সাথে যখন শহরে আসতাম তখন ফারুকী পার্কের সামনে যেতেই এই লাইব্রেরীটি দেখতাম। বড় বড় দুটি সাইন বোর্ড ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাবলিক লাইব্রেরী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইসলামিক সেন্টার। ২০০৩/০৪ সালের দিকে এক মাদ্রাসা পড়ুয়া বড় ভাইয়ের কাছে বললাম এটা আবার কি লাইব্রেরী কোনদিন খোলা দেখলাম না। ঐ বড় ভাই বললেন, আরে বোকা এটাতো প্রতিদিন সন্ধ্যায় খোলে।তিনি একদিন সন্ধ্যায় আমাকে এখানে নিয়ে এলেন। ভাদুঘর আলিয়া মাদ্রাসার একজন শিক্ষক লাইব্রেরীর উপর তলায় অবিস্থিত ইসলামিক সেন্টারের দায়িত্বে ছিলেন। উনার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে উপরতলাটা ঘুরে ঘুরে দেখালেন। দেখলাম সারি সারি আলমারীতে অনেক ইসলামী বই।

পরে আসলাম নিচ তলায়। এখানে এসেতো আরো অবাক।চারিদিকে বড় বড় অলমারিতে নতুন পুরাতন কত বই। সব নানান ভাগে ভাগে সাজিয়ে রাখা। মাজখানে বড় বড় কয়েকটা টেবিলে অনেক মানুষ পত্রিকা ম্যাগাজিন, বই পড়ছে। সেখানে একটি রেজিষ্টার ছিলো। নিজের নাম, ঠিকানা লিখে কি পড়ব বা পড়ছি তা লিখতে হতো। তারপর থেকে সেখানে যতবার গিয়েছি শুধু পত্রিকা বা ম্যাগাজিনই পড়েছি।এখানকার বই এখানে বসেই পড়া যায় তা জানি।কিন্তু সংকোচে কখনো তাদের কাছে বই পড়তে চাওয়া হয়নি। এর দু তিন বছর পর এবার এই লাইব্রেরীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুহম্মদ মুসা স্যার নিজেই আমাকে এখানে বই পড়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। যা আমার কাছে একটি স্মরণীয় স্মৃতি।

চলবে…

মনিরুল ইসলাম শ্রাবণ

রচনা: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

বিঃদ্রঃ বানান ভুল ও তথ্য বিভ্রাট পরিলক্ষিত হলে শুধরিয়ে দিলে উপকৃত হবো

Some text

ক্যাটাগরি: সাহিত্য, স্মৃতিচারণ

[sharethis-inline-buttons]

Leave a Reply

আমি প্রবাসী অ্যাপস দিয়ে ভ্যাকসিন…

লঞ্চে যৌন হয়রানি