শনিবার রাত ১২:২৯, ৩০শে চৈত্র, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ. ১২ই এপ্রিল, ২০২৪ ইং

রুহুল আজাদ খানের বাড়ির ছাদে সবুজ উঠান

৭৫০ বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

সেদিন ছিল শ্রাবণের প্রথম দিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ। চারদিকে মুষলধারে বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া। এমন অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরমার্কেটে প্রায় ১ ঘন্টা আটকে পড়ে গেলাম। বৃষ্টি শেষ হওয়ার পর পুরানো কাচারী নার্সারী মার্কেটের এক দোকানীর কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে পশ্চিম মধ্যপাড়া মহল্লার খানভিলার দিকে ছুটে চললাম। কাংখিত বাসায় আসতে তেমন কোন সমস্যা হয়নি। বাড়ীর সামনে প্রায় ৭/ ৮টি ৬০/৭০ ফুট উচু মেহগনি, করই ও আকাশী গাছ দেখে চোখ আটকে গেলো। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। মনে হচ্ছিল ভুলে হয়তো কোনো কাঠ বাগানে চলে এসেছি। এমন সময় বাড়ীর গেইটে নক করার পরপরই বাড়ীর মালিক মোঃ রুহুল আজাদ খান হাসিমুখে দরজা খুলে দিলেন। অতঃপর আমাকে নিয়ে গেলেন উনার সখের ছাদ বাগানে।

ছাদে প্রায় ৬০টির মতো ছোট/বড় সাইজের মাটির টপে সারিবদ্ধভাবে লাগানো আছে বিভিন্ন প্রজাতীর ফুল-ফল ও ঔষধি গাছ। এমনা অপূর্ব দৃশ্য দেখে আমি আবিভূত হয়ে গেলাম। আম, জাম্বুরা, আমরা, বিভিন্ন জাতের আম ও পেয়ারা, কমলা, মালঠা, ঢেওয়া, বিভিন্ন জাতের বরই, বেগুন, বরবটি, পুইশাক, মিষ্টিকুমরা, লাউ, বিভিন্ন জাতের আদা ও লেবু, করমজা, মেসটা, বিভিন্ন জাতের কাচাঁ মরিচ, ক্যাপসিক্যাম, পাথলকুচী, মেহেদী, হলুদ, ঘৃতকুমারী, সাজনা, পুদিনা, তুলসি, থানকুতি, ডায়াবেটিক গাছ, ধনিয়া পাতা, রসনগজের পাতা, রজনীগন্ধা, গাদা, বিভিন্ন জাতের গোলাপ বেনীফুলসহ সব রকম গাছের সমাহার ।

ফল থেকে শুরু করে ফুল ও ঔষাধি কোন ধরনের গাছ নেই তা এই বৈরী পরিবেশে ঝিরঝিরি বৃষ্টিতে ছাতা দিয়ে অতি আগ্রহ নিয়ে দেখতে লাগলাম। ছাদ বাগান গড়ে তোলার গল্প শুনতে চাইলে বলেন, গাছের প্রতি আমার অন্যরকম ভালবাসা। ছোট বেলা থেকেই গাছ লাগাতাম। ১৯৯০ সালে ৫/৬ জাতের গোলাপ, গাদা, রজনীগন্ধা, বেলী, পাতাবাহার ও গাসফুল নিয়ে ছাদে বাগান শুরু করেছিলাম। কিন্ত না বুঝে মাটির সঙ্গে সারের পরিমান বেশী দিয়ে ছিলাম। তখন কিছুদিন পর প্রায় সব গাছ মারা যায়। এই সময় মনের দুঃখে ছাদের বাগান করা ছেড়ে দেই। এরপর সুইডেন প্রবাসী বড় দুই ভাই যাথত্রুমে মোঃ সামছুল আবরার খান ও মোঃ নুরুল আফসার খানের অতি উৎসাহে আজাদ সাহেব জেলা কৃষি বিভাগ থেকে বিশেষ প্রশিক্ষন নেন এবং ২০০১ সালের নব্ উদ্যোগে ছাদ কৃষির কাজ শুরু করেন।

এই সময় তিনি ফুলের গাছের পরিমান কমিয়ে বিভিন্ন ফল ও ঔষধি গাছ লাগানো শুরু করেন। এসব চারাগাছ সংগ্রহ করতে গিয়ে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। গল্প চলাকালে মোঃ রুহুল আজাদ খান বলেন, এখন আমি নিজের হাতেই বিভিন্ন রকমের সবজিও ফলের গাছ লাগাই। কমলা গাছের অনেক কমলা আসছে, আমের মৌসমে আম, জামরুল, জাম্বুরা। আজকেও একঝুরি বেগুন, কাচাঁ মরিচ, ধনেপাতা, পুদিনাপতা তুলেছি নিজেদের খাবারের জন্য। মাঝে মাঝে  আত্ময়ী স্বজন ও পারা প্রতিবেশীর মধ্যে ফরমালীন বিহীন এসব ফল ও সবজি বিতরন করে দেই। শখের বশে করা এই বাগান থেকেই আমার মৌসুমি ফল ও সবজির জোগান চলে আসে। সবুজ মোরা এই ছাদে আসলে আমার মনটাই ভালো হয়ে যায়।

গল্পের এক পর্যায়ে পরিবেশন করা হলো বাগানের তাজা সবজি দিয়ে তৈরী গরম গরম পুরি ও পাকুরে। বাগানের পুদিনা, তুলশি ও ধনে পাতা দিয়ে তৈরী চমৎকার অরগানিক টি (গ্রিন টি)। কথার এক ফাকে বাড়ীর মালিক মোঃ রুহুল আজাদ খান ও উনার স্ত্রী নাসরিন সুলতানা হিরা বলেন, প্রায় ১৯ বছর ধরে আমাদের দু’ জনের পরিশ্রম আর ভালোবাসায় আজকের অবস্থায় এসেছে আমাদের  শখের ছাদ বাগান। অতিমায়িক মোঃ রুহুল আজাদ খান পেশাগতভাবে একটি বেসরকারী হাসপাতালের শেয়ার হোল্ডার এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানে চাকুরীও করেন।

এর পূর্বে তিনি কাপড়ের ব্যবসা করতেন কিন্তু উক্ত ব্যবসা তেমন সুবিধা করতে পারেন নি। প্রতিদিন তিনি কাজের ফাকে ১ ঘন্টা বাগান পরিচর্যার কাজে সময় ব্যয় করেন। তিনি বাগানে কোনো ধরনের কৃত্রিম সার ব্যবহার করেন না। নিয়মিত ভাবে ৩/৪ মাস পরপর গোবর ও সরিসার খৈল মিশ্রিত করে প্রাকৃতিক সার ব্যবহার করেন।  তবে প্রয়োজন হলে টি এসপি ও পটাস সার ব্যবহার করেন। মাঝে মাঝে পোকার আত্রুমন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে গাছে ও মুকুলে মেনাথিয়ন নামাক কিটনাশক ব্যবহার করেন। প্রতি বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়া কৃষি প্রদর্শীতে ফলসহ গাছ বিত্রিু করেন। অনেক সময় শখের বশে দুর্লভ প্রজাতির ফল ও ঔষাধি গাছ সংগ্রহের জন্যে বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ান। এই ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নার্সারীর ব্যবসায়ীরা তাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেন।

ভবিষ্যতে উনার ইচ্ছা আছে ৪০০ বর্গফুটের এই ছাদে আপেল, রামবুথান, স্টবেরী, ট্যাংক, নাশপাতী, আঙ্গুর ও চেবী ফলের চাষাবাদ করার। আড্ডা দিতে দিতে দুপুর গরিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। এবার বিদায় নেবার পালা। সিঁড়ি ধরে নামতেই চোখ জুড়ায় আম, পেয়ারা, জামরুল, জাম্বুরা, কমলা, মালটা মিলিয়ে প্রায় ২০০ গাছের কচি পাতার ঘ্রাণ। বড় গাছের বৃত্ত থেকে মাতা তুলে নিজের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে লালশাকের কোমল পাতা। আর ছাদের ধার ঘেষে হাওয়ায় দোল খাচ্ছে লাউ, মিষ্টি কুমড়া আর পুইশাকের কচি ডোগা। এই দম্পতির মতো এমন উদ্যেগী মানুষের সংখ্যা এখন বাড়ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া মধ্যপাড়া মহল্লার গন্ডি পেরিয়ে এ বাতাস ছরিয়ে পরছে রাজধানী সহ মফস্বলের অলিতে গলিতে। প্রথম দিকে ছাদের কোনায় টবে রকমারী মৌসুমি ফুল গাছ লাগানো ছিল মানুষের শখ ।এই শৌখিনতা থেকে এখন কৃষি খাতে অবদান রাখতে শুরু করেছে ছাদের ফলমুল-সবজি।

গত প্রায় পাঁচ মাস পূর্বে দেশ দর্শন পত্রিকার জন্য এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিলাম, কিন্তু সময়ের অভাবে প্রকাশ করতে পারিনি। আজ সেটি প্রকাশ করলাম। আজ ১০ পৌষ, রোজ বুধবার। 

খায়রুল আকরাম খান : ব্যুরো চীফ, দেশ দর্শন

Some text

ক্যাটাগরি: নাগরিক সাংবাদিকতা, মতামত

[sharethis-inline-buttons]

Leave a Reply

আমি প্রবাসী অ্যাপস দিয়ে ভ্যাকসিন…

লঞ্চে যৌন হয়রানি