বুধবার সকাল ৯:৫৯, ৫ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ. ১৯শে জুন, ২০২৪ ইং

শুধু দশ মিনিটের জন্য…

মনযূরুল হক

পল্টনকেন্দ্রিক আমাদের একটা পরিমণ্ডল ছিলো, এই ভয়েই সেটা ভেঙে গেছে। আমরা পাঁচটা বন্ধু কোথাও বসে বন্ধুর মতো আড্ডাও দিতে পারি না, ভয় পাই। গত কয়েক বছর বইমেলা থেকে অহেতুক কয়েকজন মাদরাসা ছাত্রকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাই এবার বইমেলায় যেতেও ভয় পেয়েছি। সেদিন বিকেলে বাসায় ফিরতে গিয়ে দেখি রাস্তায় লীগের ছেলেরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে টহল দিচ্ছে, কোনো সংবাদে-নিউজে তাদের ছবিও আসে নাই। সম্ভবত... সাংবাদিকরাও প্রচণ্ড ভয়ে আছে।

 

জনাব উবায়দুর রহমান খান নদভী বেশ কিছু দিন আগে সাপ্তাহিক দেশ-দর্শন পত্রিকায় একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন— আলেমদের ঐক্য মাত্র ১০ মিনিটের ব্যাপার। পত্রিকার সম্পাদককে একবার হাতেনাতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম— আপনি কেনো তাকে উল্টো প্রশ্ন করলেন না যে, যেখানে রাস্তার জ্যামে দৈনিক বাংলাদেশের মানুষের ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, সেখানে আপনাদের সময়ের কি এতোই মূল্য যে, মাত্র ১০ মিনিট সময় বের করতে পারছেন না?

কয়েকদিন আগে দেখলাম, মামুনুল হক Mamunul Haque সাহেবও ঐক্য নিয়ে জোর গলায় আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও ইসলামী ঐক্যজোটের অন্যতম শরিক তারা, যাদের একাংশ (দুঃখিত, ইসলামী ঐক্যজোটও এতোটা বিভক্ত যে, সে অংশে মামুন সাহেবরা আছেন কি না নিশ্চত নই) সেদিন ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে গিয়ে ‘বিদেশ থেকে টাকা এনে লুটপাটকারীদের’ বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন ‘মানবতার মূর্তপ্রতীক’ এবং জোর গলায় বলেছেন ‘আওয়ামীলীগ এলে ইসলামের কল্যাণ হয়’।

তাদের প্রথম দাবিটা যে ইতোমধ্যেই পূরণ হয়েছে, তা খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তারির মধ্য দিয়ে পরিষ্কার। যদিও এদেশের মানুষ ধরেই নিয়েছে হুজুর মানেই বিএনপি, হিন্দু মানেই আওয়ামীলীগ এবং কম্যুনিস্ট মানেই নাস্তিক। ফলে সেদিন দেখলাম, লীগের একজন নেতা ঐক্যজোটের ঘোর সমর্থক জনৈক আলেমকে টিপ্পনী করে বলছেন— আপনাদের নেত্রীকে তো জিপিএ ৫ পাওয়াই দিলাম।

এই টিপ্পনী হলো আলেমদের অনৈক্যের একটি সাধারণ অপমানের ধরন। যদিও ‘খালেদা জিয়া জেলে গেলেই কি আর না গেলেই কি’ এমন একটা ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে আলেমগণের কথাবার্তায় । উপায় নাই তো। কে জানি খালেদা জিয়া ও সাঁপের ছবি দিয়ে পোস্ট করেছে—কে বেশি ভয়ঙ্কর। একজন কমেন্ট করেছে—শেখ হাসিনা। তাকে গতকাল গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সুতরাং সবাই চুপ মেরে আছে।

বিখ্যাত এক খতিব সাহেব গতকাল জুমার বয়ানে শতাধিক বস্তা সিমেন্ট কালেকশন করেছেন। জুমার পরে তাকে ধরে জিজ্ঞেস করলাম—আমাদের জন্য কিছু বলুন। জিজ্ঞেস করলেন—কী সমস্যা। বললাম—আমরা ভয় পাচ্ছি, প্রচণ্ড ভয়। শাহবাগ গণজাগরণের পরে যেমন ভয় জেঁকে উঠেছিলো, তেমন ভয়। হেফাজতের উত্থানে যদিও সেই ভয় কিছুটা কেটেছিলো, কিন্তু ৫ মে’র পরে আবারও আমরা ভয় পেতে শুরু করেছি।

বললাম—পল্টনকেন্দ্রিক আমাদের একটা পরিমণ্ডল ছিলো, এই ভয়েই সেটা ভেঙে গেছে। আমরা পাঁচটা বন্ধু কোথাও বসে বন্ধুর মতো আড্ডাও দিতে পারি না, ভয় পাই। গত কয়েক বছর বইমেলা থেকে অহেতুক কয়েকজন মাদরাসা ছাত্রকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাই এবার বইমেলায় যেতেও ভয় পেয়েছি। সেদিন বিকেলে বাসায় ফিরতে গিয়ে দেখি রাস্তায় লীগের ছেলেরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে টহল দিচ্ছে, কোনো সংবাদে-নিউজে তাদের ছবিও আসে নাই। সম্ভবত… সাংবাদিকরাও প্রচণ্ড ভয়ে আছে।

বললাম—শায়খুল হাদিস ও মুফতি আমিনী সাহেবকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, সে-সময়ও আমরা ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু সেই ভয়ের সাথে গর্ব জড়িয়ে ছিলো। কেননা, তাদের ঐক্য ছিলো, ফলে তাদের কথায় আমাদের আস্থা ছিলো। তাই বিবাড়িয়ার ৬ শহিদ ও চৌধুরিপাড়ার শহিদি মসজিদের কথা এখনও আমরা বুক ফুলিয়ে বলি। কিন্তু এখন আমরা কার প্রতি আস্থা রাখবো।

বললাম—কিন্তু এখন আমরা ভয়ের সাথে লজ্জা পাচ্ছি। ভিক্ষাবৃত্তির লজ্জা, হুজুরে হুজুরে চুলাচুলির লজ্জা, ৫ মে’র পরে প্রকাশ্যে খুনীদের ‘বন্ধু’ বলার লজ্জা, কওমি সনদপ্রাপ্তি আমাদের লজ্জা কমায়নি, বরং তাদের ‘মেহমানদারি’ সেই লজ্জা আরও বাড়িয়েছে। এখন আবার নতুন করে তাদের ‘মনবতার মূর্তপ্রতীক’ বলা, আর তাদেরকে ‘ইসলামের কল্যাণকারী’ বলার পরে আমরা এখন মুখ দেখাই কোথায়?

আরও বহু কথা হলো। তিনি বললেন—তোমরা এখন কী চাও? বললাম—আমরা একটা আস্থার জায়গা চাই। একটা অথিরিটি চাই, যাদের কথা আমরা নির্দ্বিধায় রেফার করতে পারবো। যাদের কথায় আমরা উঠবো-বসবো-চলবো এবং প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ করেও মন খুলে হাসবো।

লক্ষ লক্ষ মিনিটের বিনিময় হলেও আমরা আপনাদের সেই ১০ মিনিট সময় চাই…নইলে একদিন আমাদের লজ্জা কেটে যাবে। তারপর…

মনযূরুল হক : সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক
manzurul.haque267@gmail.com

ক্যাটাগরি: ইসলাম,  প্রধান কলাম

ট্যাগ:

[sharethis-inline-buttons]

Leave a Reply