মঙ্গলবার বিকাল ৪:৫৩, ১০ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ. ২৩শে এপ্রিল, ২০২৪ ইং

ছেনালি সুখের কথা (ছোট গল্প)

২১২৭ বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

আমার বয়সটা বেড়ে পঁয়তাল্লিশ ঠেকলো। ক্যারিয়ারে সফল একজন পুরুষ। প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদারি ব্যবসা করি। কনস্ট্রাকশন কাজে রড সিমেন্ট কম দিয়ে সেই টাকায় ফ্ল্যাট গাড়ি করে নিজে যৌন অসন্তুষ্টিতে ভুগছি। বউয়ের মেয়াদ পেরিয়েছে ইদানিং মনে হয় নড়েচড়ে কম।

মেয়াদ পার করা বউয়ের নাম জোনাকি। আমি তাকে জোনাক পোকা ডাকি। পাহাড় সমান পতিভক্ত এক উপদ্রব যেন! ওদিকে অল্পবয়সী মেয়ে দেখলেই আমার মনে ফাগুনের হাওয়া বইতে শুরু করে। প্রকৃতির খেয়াল খুশিতে সন্তান হয়নি আমাদের। সমস্যাটা আমার না, জোনাকির। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি। তারা নানা রকম ওষুধ দিয়েছে। কবিরাজকে দেখিয়েছি, ভরসা দিয়েছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নাম না জানা গাছের শেকড় চিবিয়েছি কতো!

রাত জেগে চেয়েছি প্রভুর কাছে। একটা ভ্রুণের জন্য কতো কেঁদেছি। ঈশ্বর আমাদের ডাক শোনেনি। জোনাকির পেট স্ফিত হয়নি। আমিও বাবা হতে পারিনি। আমি দীর্ঘশ্বাস চেপে জোনাকির নিরাভরণ সফেদ পেটের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। একটা বাবু সেখানে আমাদের এলেও এতে পারতো! নাকি আমার মতো বদমাশ বহুগামীদের বাবা হতে নেই? এক ঝড়ের রাতে আদরের পর আমার কপালে চুমু খেয়ে জোনাকি বলেছিলো, তুমি আরেকটা বিয়ে করলে বিশ্বাস করো আমি কষ্ট পাবো না। না হয় সেই নবজাতক কথা বলতে শিখলে আমাকে বড়মা বলে ডাকবে! কৌতুক ভেবে হেসে উঠেছিলাম।

তারপর বিদ্যুৎ চমকাবার আলোয় দেখি, তার চোখভরা ‘না পাওয়ার’ জল। কেবল সময়ের ব্যবধানে জোনাকির সঙ্গে রচিত হয়েছে এক অদৃশ্য দেয়াল। যার ওপারে হাত বাড়ালে বউটারে বড় অচেনা মনে হয়। বয়স ছেচল্লিশ পার হওয়ার পর এক বসন্তে আমার একটা প্রেম হলো। নিজের অফিসে চাকরি দিতে গিয়ে প্রেমটা হলো। আমার অফিসে কর্মরত বেশ চটপটে সেই মেয়েটির নাম তনু। শর্ট ডিভোর্সী। রোজ দুই বেণী করে চোখে হালকা করে কাজল দিয়ে অফিসে আসতো। এমনভাবে তাকাতো আমার দিকে যেন চোখ দিয়েই গিলে ফেলবে পুরোটা। আমার গা আবার গরম হতে শুরু করে। ভালো লাগছিলো না কিছুই। মনে হচ্ছিলো, একটু মদ খেতে পেলে ভালো হতো।

সেদিন প্রিন্টের সূতির শাড়িতে তনুকে লাগছিলো সুস্মিতা সেনের মতো। ওর পদ্মনাভির দিকে তাকিয়ে মনে হলো, ওখানে কিছুদিন কাটিয়ে আসি। কথাবার্তা ছলে বসতাম ওর কাছাকাছি ঘেঁষে ৷ কয়েকদিন পর এডাল্ট কথা বলা শুরু করি। ক্ষত হৃদয়ের মধ্য বয়সে এসে ঈশ্বর ছাড়া সকলের অগোচরে আমি ওর দেহে হাত দিয়েছি । আমার দুহাতে লেগে থাকে নিষিদ্ধ গন্ধ। ও একটু হাসে। ওর গজদাঁত বেরিয়ে আসে তাতে। মিষ্টি একটা পারফিউমের গন্ধ নাকে আসে। যতোবার বিদেশে গিয়েছি, ফেরার সময় ওর জন্য বিলাসদ্রব্য কিনেছি দুহাত ভরে। তনু সেসব ব্যবহারে আরো টিপটপ হয়েছে, রূপবতী হয়েছে। এ ক্যাটাগরির ড্রাগে যেভাবে মানুষ আসক্ত হয়ে পড়ে, তনুর প্রতি আমার টান তবু বাড়ছিলো সেভাবে।

নির্জনে নিভৃতে আমাকে শরীর দিয়ে তনুর একটা আয়েশী চাকরি বাগানো তার কাছে আশীর্বাদের মতো। যেন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে বিন্দুমাত্র সুযোগ পেলেই হাতের টানে শাড়ি খুলে আমার সামনে সবচাইতে সুন্দর পরীটি হয়ে বসে থাকা। বিয়ে না করে একসাথে থাকছি। আমি ফার্মেসি থেকে প্রতিরক্ষা বর্ম, বেলুন কিনে আনতাম। গত পরশু তনুকে পাশে নিয়ে সাতচল্লিশতম জন্মদিনের কেক কাটলাম। আবাসিক হোটেলের একটা নীল নাইটি পড়ে মুখে বিদেশী ক্রিমের গন্ধ নিয়ে আমার বুকে শুয়ে চুলে হাত বুলিয়ে দেয় অপরাধবোধের কথা শোনাতে থাকতো গড়গড় করে।

এক বৃষ্টির রাতে আমাকে চুমু খেয়ে বলেছিলো, পুরুষ কয়েকরকম দেখেছি। তোমাকে তার মাঝে আমার প্রভুভক্ত কুকুরগোত্রীয় লেগেছে। আমার উরুসন্ধিতে লেপ্টে থাকো সুযোগ পেলেই। শুনে খুব হাসছি। হেসে সুখের স্পর্শ পেতে গড়িয়ে পড়ছি ওর শরীরে। আমিও সুযোগ পেলেই তনুর শরীরের সাথে মিশে ওম নিতাম। আর নির্লজ্জের মতো ওর দেহটা চেটেপুটে খেতাম। মনে হয় আমি জন্মগতভাবেই ছিলাম বহুগামী।

তনুকে কিস্তিতে ফ্ল্যাট কিনে দিলাম। সে সেখানে মা-ছোট বোনকে নিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করতো। ওর মা সব বুঝতেন। তনুর মা তেমন কথা বলতো না তার মেয়ের সাথে। তারা তনুকে রক্ষিতা হবার জন্য জন্ম দেয় নাই। আমি মাঝে মাঝে রাতে সেখানে থাকতাম।

আমি মদ খেয়ে টিভি ছেড়ে চ্যানেল ঘুরাতাম। দীর্ঘশ্বাস ফেললে সেখান থেকে বেরুতো অ্যালকোহলের ছেনালি গন্ধ। মাঝে মাঝে বন্ধু-বান্ধবদের ডাকলে মদ খেয়ে চলতো গানের আসর। সবাই বিদায় নিলে ঘোরগ্রস্ত একেকটা রাত কাটাতাম ওর সাথে। আমার বন্ধুরা তনুকে আড়ালে ডাকতো বেশ্যা। আমি ডাকতাম ঈশ্বরী। প্রহসনের সমাজে কে কাকে বেশ্যা ডাকে, কেন ডাকে বোঝা দায়। অন্যেরা বলাবলি করে, বিয়ে না করে রামলীলা চালাচ্ছি আমরা। কোথায় গিয়ে ঠেকেছে সংস্কৃতি!

সমাজ জানে তনু আর আমি অবৈধ পরকীয়ায় লিপ্ত। মানুষ আমাদের সহজিয়া সুখ দেখে হিংসার চোখে তাকিয়ে থাকে। মদ বেশ কয়েক পেগ পেটে পড়ার পর নিঃশ্বাস থেকে অ্যালকোহলের গন্ধটা ভাগাভাগি করে নেয়া আর অপরাধ মনে হয় না। তনু শখ করে একটা পান খেয়ে ফেলেছে। ঠোঁট লাল সেই মুখের দিকে বাধ্য না হলে আমি তাকাচ্ছিলাম না। তাকালেই কেমন মাথা ঝিমঝিম করছিলো। অতো সুন্দর তো কেবল দেবীর মুখ হয়।

নারী তো, আমার ভালো লাগাটা খুব বুঝতে পারছিলো। আবারো গজদাঁত বের করা সেই হৃদয় ভাংচুর করা হাসিটা দেয়। মেয়েটার জগত বলতে ছিলাম শুধু আমি। মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠতো। যৌবনের মধু খাওনের লাইগা আসন্ন ছেনালি ডেটিং এর সময় ঘনিয়ে এলে। অপরাধবোধ ধামাচাপা দিতে তনুর জন্য কিনে নিয়ে যেতাম দামী উপহার। তনু সেদিকে না তাকিয়ে আমার লোমবিহীন পাষণ্ড বুকে শুয়ে থাকতো শিশুর মতো। ও একসময় বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যেতো। আমি ওর নিঃশ্বাস গুনতাম।

মেয়েটার একমাত্র দুর্বলতা ছিলো, আমার জীবনে আসার আগে এক পশুর সাথে কয়েক মাসের পাশবিক নির্যাতনে সংসার করে এসেছে। বিবেকের দংশন, অন্ধ ভালোবাসা আর বিয়ে না করা কথিত রক্ষিতাকে নিয়ে আমি দিব্বি পুরুষতান্ত্রিক একটা বহুগামী জীবন সুবিধাবাদী আচরণে কাটিয়ে দিলাম। বিছানায় খুশি হয়ে ওর মন ভালো করার জন্য একবার আহলাদি গলায় পবিত্র ভোর সময়টায় বলেছিলাম, মেয়ে হলে নাম রাখবো তুলি। রাগ উঠলে তনু আমার শরীরের নানা জায়গায় কামড় দেয়। এটা ওর বিচ্ছিরি অভ্যাস। অতি আদরে মানুষ বাঁদর হয়।

এর মাঝে দুই মাসের পেট বাঁধিয়ে বসে। ওকে ভালো ক্লিনিকে নিয়ে গেলাম। সুন্দরী এক ডাক্তার ভদ্রমহিলা ওয়াশ টোয়াশ করে আমায় অসহায় রক্তমাখা মাংসপিন্ড দেখালো। মনে মনে নিজেকে বললাম, এই এক জীবনে বোধহয় খুন করাটাই বাকি ছিলো! আরো কতো কি!

আবারও সেই একই ঘটনা, পেট আবার দুশমন ঢুকল! আমাকে সময়মতো জানায় না। ডাক্তারের কাছে তাকে নিয়ে গিয়ে জানতে পারি, চার মাসের প্রেগন্যান্ট, ভ্রুণ ফুলেফেঁপে বেশ। ফেলে দিতে চাইলে ব্যাপারটা খুনখারাবিতে গিয়ে ঠেকবে। শুনে আমি চিৎকার করে বলি, অসম্ভব ! অসুস্থ তনুর গালে সজোরে চড় মারি। সাহসী ডাক্তার বললো, আমার ক্লিনিকে বসে একজন নারীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করছেন আপনি। কতো বড় সাহস আপনার!

ভোগের উদ্দেশ্যে এক নারীকে বিয়ে না করে তাকে দিয়ে খেয়ালের বশে পৃথিবীতে এনে আবার একগাদা টাকা খরচ করে দামী ক্লিনিকে নিয়ে আয়োজন করে মেরে ফেলেছি। অপারেশন থিয়েটারের আমার চোখের দিকে খুব কাঁদলো তনু। তার পরনে ঢিলেঢালা আকাশী নীল জামা।

ওর দুর্বল হাত আমার হাতটাকে আঁকড়ে ধরে অভিমানী সুরে বলছে, মা হতে চাইবার বিশুদ্ধ অভিলাষের কথা আর তুমি কেন পেটের ওকে মেরে ফেলতে চাইছো? খুব তো বলতে, মেয়ে হলে নাম রাখবে তুলি। এখন বুঝি ভ্রুণ হত্যার নেশা চেপেছে মাথায়? আমি অজ্ঞান করবার বিশেষজ্ঞ ভদ্রলোককে চোখ ইশারা করি। উনি দক্ষতা দেখিয়ে তনুর চোখে অন্ধকার ঘনিয়ে আনেন। ক্লিনিকে বিশ হাজার টাকা ক্যাশ দিয়েছি। ঘন্টাখানেক পর আমাকে ডেকে সুন্দরী নার্স বলে, আবর্জনা পরিষ্কার করে দিয়েছি। হুঁশ ফিরলে আপনার তনুকে নিয়ে এবার নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি যেতে পারেন।

নিজেকে বড্ড খুনী মনে হতে থাকে আমার। হঠাৎ রাস্তা থেকে উঠে আসা বেশ কিছু কুকুর আমাকে দেখে গাড়ি ঘিরে একটানা ঘেউঘেউ করতে থাকে। আমি ভয় পেয়ে গাড়ির গ্লাস উঠিয়ে দেই। আমি সিটের সঙ্গে সেঁধিয়ে যেতে থাকি। আমার গলায় জমাট বাঁধে কি যেন। তারপর থেকে কেমন চুপচাপ হয়ে গেলো তনু। প্রায় সময়ই ছাদে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে একাই কথা বলে। আমাকে দেখলেই কেন যেন ভয় পেয়ে উঠতো। আমি কাছে গেলেই চিৎকার করে বলতো, অমানুষের বাচ্চা কাছে আসবি না।

মাঝে মাঝে ও কেমন খুনী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। এক অভাগী যে সমস্ত জীবন সঙ্গম সাধনায় ঈশ্বরী হবার চেষ্টায় রত ছিল। আর ঈশ্বরী হতে গিয়ে লাথি, চড়, চুমু সব পেয়েছে। কেবল নিজের কল্পনাপ্রসূত ভালোবাসাটা পাইনি। চির অতৃপ্ত হৃদয় কখনো ভালোবাসা পায় না। কিংবা পেলেও তার মর্ম বোঝে না। আত্ম অনুসন্ধান করতে গিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে কষ্ট দিয়েছি বহু।

তারপর একদিন সন্ধ্যায় দরজার খিল দিয়ে ফ্যানে শাড়ি পেঁচিয়ে ঝুলে পড়ে তনু। ওর পায়ের দাপাদাপি থেমে শরীরটা ক্রমে ঠাণ্ডা হতে শুরু করার পর বাড়ির মানুষজন জানতে পায় সর্বনাশের কথা! তনুর মা ঘরের টেবিলের এক কোণায় রাখা প্রশ্নবোধক অভিব্যক্তিতে তাকিয়ে থাকে। তনু চেয়ার থেকে পা দুটো সরিয়ে নেয়ার পরের মুহূর্তে আমার মনে হয়, মেয়েটা অবুঝের মতো আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলো।

একটু পর ফজরের আজান হবে। এ সময়টাকে আমি খুব ভয় পাই। আমার মনে হয়, মুয়াজ্জিন সাহেব এ সময়টায় আমার মনের কষ্ট বুঝে ফেলেন। আমি তখন উঠে দাঁড়িয়েছি। চোখ বেয়ে পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই কথাটার বুক মাড়িয়ে তখন টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। হাত পা সারাক্ষণ কাঁপছে। আমার নার্ভাস সিস্টেম ভেঙে পড়েছে। নিজের ছায়া দেখে চমকে উঠি। ঘুমের মাঝে জেগে উঠি চিৎকার করে।

আমি ছাদ থেকে লাফ দিতে চাইনি। কেউ শখ করে অতো উঁচু থেকে লাফ দেয় না। খুব বেঁচে থাকতে চাইতাম। রাস্তায় ধুপ করে শব্দ হয়ে নিচে পড়ে রয়েছে আমার নিথর দেহ। মাথার কাছটায় রক্তের বন্যা, ঘিলু কিছুটা বেরিয়ে আছে। মৃত্যুর আগে হাওয়ায় ভাসমান অবস্থায় শেষ কথা ছিলো, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আরো কিছুটা দূরে কুকুরের চিৎকার। আশেপাশের হতভম্ভ মানুষের চাপা আর্তনাদ, কান্না।

জাহাঙ্গীর আলম বিপ্লব: লেখক, সংবাদকর্মী 

Some text

ক্যাটাগরি: গল্প, সাহিত্য

[sharethis-inline-buttons]

Leave a Reply

আমি প্রবাসী অ্যাপস দিয়ে ভ্যাকসিন…

লঞ্চে যৌন হয়রানি