শুক্রবার রাত ১১:০৬, ২৯শে চৈত্র, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ. ১২ই এপ্রিল, ২০২৪ ইং

চিনিকলের বর্জ্যে মারাত্মক দূষণের কবলে তুলশীগঙ্গা নদী: দুর্ভোগে ৫০ হাজার মানুষ

৪৫৫ বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

জয়পুরহাট চিনিকলের অপরিশোধিত বর্জ্য নিঃসৃত হয়ে নদীতে মিশে পানির রং পরিবর্তন হয়ে কালচে আকার ধারন করার পাশাপাশি মারাত্মক দূষণের কবলে পড়েছে তুলশীগঙ্গা নদী। ফলে মারা যাচ্ছে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী। বেড়েছে মশা-মাছির উপদ্রব। এই পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না গৃহস্থালি বা কৃষিকাজে  । বর্জ্য মিশ্রিত পানির দুর্গন্ধে স্বাস্থ্য ঝুকিসহ নানা দুর্ভোগে পড়েছেন নদী তীরবর্তী ২০ গ্রামের প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ। তাদের অভিযোগ চিনিকলের বর্জ্য নদীতে মিশে মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। তবে তা মানতে নারাজ চিনিকল কর্তৃপক্ষ।

১৯৬১ সালে ১৮৮ দশমিক ৮৭ একর জমির ওপর নির্মিত জয়পুরহাট চিনিকল বর্জ্য শোধনাগার ছাড়াই ১৯৬৩ সাল থেকে চিনি উৎপাদন করে আসছে। চিনিকল থেকে একটি নর্দমার মাধ্যমে অপরিশোধিত বর্জ্য নিঃসৃত পানি অপসারণ করা হয়। সেই পানি খাল-বিল হয়ে মিশে তুলশীগঙ্গা নদীতে। জামালগঞ্জ পাঁচ মাথা থেকে তুলসীগঙ্গা নদী পর্যন্ত এবং আক্কেলপুর পৌরশহরের সোনামুখী সেতুর দক্ষিণ পাশের অংশ থেকে অন্তত ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত  তুলসীগঙ্গা নদীর পানি কালচে হয়ে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। দুর্গন্ধে চরম স্বাস্থ্য ঝুকিসহ নানা অসুবিধায় পড়েছে স্থানীয়রা। এদিকে সেচের পানি দূষিত হওয়ায় একদিকে ঠিকমত ফসলের ফলন পাচ্ছেন না কৃষকরা অন্যদিকে মারা যাচ্ছে নদীর মাছসহ জলজ প্রাণী।

 

পশ্চিম হাস্তাবশন্তপুর গ্রামের দেলোয়ার হোসেন বলেন, তুলসীগঙ্গা নদীর সোনামুখী খেয়াঘাট থেকে হলহলিয়া রেলসেতু পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার নদীর পানি কালচে হয়ে গেছে। যা ব্যবহারে অনুপযোগী।

নদী পাড়ের বাসিন্দা সোনামুখী গ্রামের  আমেনা বেগম বলেন, একসময় আমরা এই নদীর পানিতেই রান্না ও গোসলের কাজ করতাম কিন্তু  সুগার মিল চালু হওয়ার পর  নদীর পানি কালো হয়ে যাওয়ায়  এখন আর সেই পানি ব্যবহার করতে পারি না।

আওয়ালগাড়ি গ্রামের কৃষক আব্দুল বাসেদ বলেন, “শ্রী খালের পানি দিয়ে জমিতে সেচ দিতাম। খালের পানি কালচে হওয়ায় সেচ দেওয়া যাচ্ছে না। পানির অভাবে আমার সবজিক্ষেতের অনেক ক্ষতি হচ্ছে।”

একই এলাকার  জয়নাল মিয়া বলেন, ওই পানি থেকে এতটাই দুর্গন্ধ ছড়ায় যে সন্ধ্যার পরে বাড়িতে থাকা দুর্বিষহ হয়ে পড়ে।

মৎস্যজীবী খয়বর আলী বলেন, নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে মাছ মারা গেছে। নদীর ওপর নির্ভরশীল মৎস্যজীবীরা আর নদীতে মাছ পাচ্ছি না। পরিবার-পরিজন নিয়ে আমরা কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। খুব শীঘ্রই এ ব্যাপারে সরকারের বা স্থানীয় প্রশাসনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

শ্রী খাল পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সভাপতি আবু মোতালেব বলেন, চিনিকলের বর্জ্য খালে আসায় সমিতির পক্ষ থেকে খালে ছাড়া সব মাছ মরে গেছে। খালের পানি কৃষকরা ব্যবহার করতে পারেন না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষর কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও কোনো কাজ হয়নি।


আক্কলপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম বলেন, বিশেষত আখমাড়াই মোসুমে এই সমস্যা প্রকট হয়। এই পানি কোনভাবেই কৃষিকাজে ব্যবহার করা যাবে না বলে সতর্ক করেন তিনি।

এদিকে চিনিকলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, পরিবেশ দূষণের জন্য চিনিকলের অপরিশোধিত বর্জ্য নিঃসৃত পানি এককভাবে দায়ী এমন অভিযোগ ঠিক নয়। পানি শোধনাগার না থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বর্তমানে বর্জ্যসহ পানি চিনিকলের নিজস্ব ক্যানেলে নেওয়া হয়। “শুধু যন্ত্রপাতি ধোয়ার স্প্রে করা পানি বের করে দেওয়া হয়। তা-ই কেবল জেলার বিভিন্ন নালা ও খাল বেয়ে নদীতে পড়ছে। তবে তা পরিবেশের জন্য কোনো ক্ষতির কারণ নয়।”

তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন, জেলার কয়েক হাজার চালকল ও মুরগি খামার থেকে দূষিত পানি নদীতে ফেলা হচ্ছে বলেই নদীর পানি দুষিত হচ্ছে । “এককভাবে চিনিকলকে দায়ী করা দুঃখজনক।”  আগামী বছর চিনিকলের জন্য বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ করা হবে বলেও জানান তিনি ।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, বর্জ্য শোধানাগার প্রকল্পের জন্য ৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। কিছু টাকা তারা পেয়েছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এ সমস্যা লাঘব হবে।

শফিউল বারী রাসেল, জয়পুরহাট থেকে।

Some text

ক্যাটাগরি: খবর, নাগরিক সাংবাদিকতা

[sharethis-inline-buttons]

Leave a Reply

আমি প্রবাসী অ্যাপস দিয়ে ভ্যাকসিন…

লঞ্চে যৌন হয়রানি