সোমবার সকাল ১১:৫৯, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ. ২৪শে জুন, ২০২৪ ইং

আমার দেখা রূপ-বৈচিত্র্যের মালয়েশিয়া

১০৬৯ বার পড়া হয়েছে
মন্তব্য ০ টি

মালয়েশিয়া; পর্যটন বিশ্বের অন্যতম আকষর্ণীয় স্থান। উক্ত অপরূপ বৈচিত্র্যের দেশে ভ্রমণ করার জন্যে আমার তীব্র আগ্রহ জাগে। ঢাকার মালয়েশিয়ার দূতাবাস থেকে ট্যুরিষ্ট ভিসার ব্যবস্থা করে ২৮.০৪.১৯৯৩ সালে বিকাল ৫ টার দিকে বাংলাদেশ বিমান যোগে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। এ সময় আমার সফর সঙ্গী ছিলেন মাসুদ, গোলাম নবী, রাজু, অলকপাল, আইয়ুব আলী, মোশারফ, মিলন মিয়া, মো: আলীসহ আরো অনেক বাংলাদেশী। রাত সাড়ে বারটার দিকে আমরা কুয়ালালামপুর বিমান বন্দরে অবতরণ করি। অতঃপর ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমরা বিমান বন্দর থেকে বের হই। বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আনন্দে শিউরে উঠি।

বিমুগদ্ধ হয়ে দেখছিলাম ছিমছাম ছবির মতো সাজানো গোছানো শহর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর। এরপর পেনাং প্রদেশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আমরা বাসে উঠি। আমাদের বহনকারী বাসটি ঘণ্টায় ১২০ মাইল গতিতে চলছে। কোথাও কোনো যানজট নেই। কোলাহল নেই। বিশাল চার লেনের রাস্তার দু’পাশে উঁচু উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের ঢালু ও পাদদেশে পামওয়েল ও রবারের বাগান। চারদিকে সবুজের সমারোহ, এই নৈসর্গিক সৌন্দর্য খুবই উপভোগ্য। সকাল ৭ টার মধ্যে আমরা পেনাং প্রদেশের “বাটারওয়ার্থ” কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে এসে পৌছি। অতঃপর প্রাতরাশ সেরে আমরা বাস টার্মিনাল সংলগ্ন “ইচিয়া রবার ইন্ডাস্ট্রী” নামক কোম্পানিতে গিয়ে রিপোর্ট করি ও পরের দিন কাজে যোগদান করি। আমাদের বাসা ছিল ‘সুংগাইদুয়া’ নামক স্থানে। সুযোগ পেলেই আমরা দলবেধেঁ পেনাং প্রদেশের ঐতিহাসিক দশর্নীয় স্থানগুলো দেখতে যেতাম।

পেনাং মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রদেশ। এই প্রদেশের রাজধানীর নাম জর্জটাউন। এই প্রদেশটি মালয়েশিয়ার সর্ব উত্তরে থাইল্যান্ড উপসাগরের তীরে অবস্থিত। জর্জটাউন মালয়েশিয়ার অন্যতম সুন্দর স্থান। একই শহরে হ্যারিটেজ রিয়ার টয়েস মিউজিয়াম সারা বিশ্বেই বিখ্যাত। এছাড়া রয়েছে হোপিং আইসল্যান্ড অসম্ভব সুন্দর একটি জায়গা। পাশেই রয়েছে আন্ডর ওয়ার্ল্ড ওয়াটার মিউজিয়াম সুন্দর পরিপাটি জায়গা। এছাড়াও রয়েছে পেনাং ব্রিজ, বিখ্যাত বাটুফিরিঙ্গি সমুদ্র সৈকত। এখানেই রয়েছে পেনাং এর বিখ্যাত কয়েকটি পাঁচতারা হোটেল ও সবচেয়ে উঁচু পাহাড় পেনাং হিল। এই পাহাড়ের উপর থেকে সমস্ত পেনাং শহর দেখা যায়। বেশ কিছু দিন ইচিয়া  রাবার ফ্যাক্টরীতে কাজ করার পর অতিরিক্ত গরম ও উটকো গন্ধের কারণে আমি পাইলস এবং চর্মরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ি।

এমনই পরিস্থিতে আমার রুমে স্কুল জীবনের সিনিয়র বন্ধু মোঃ আমিরুল ইসলাম আলোক দেবদূতের মতো এসে উপস্থিত হয়। সে আমাকে সেবা-যত্ন করে সুস্থ্য করে তুলে। এদিকে আমার ভিসার মেয়াদ মাত্র দু’মাস আছে। এই বৈরী অবস্থায় অনেক ভেবে-চিন্তে একদিন সুযোগ বুঝে অতি গোপনে পেনাং শহর ত্যাগ করে আলোকের ইপো শহরের বাসায় এসে আশ্রয় গ্রহণ করি। ইপো হলো পেরা প্রদেশের রাজধানী। মালয়েশিয়ার উত্তরে হলো পেনাং প্রদেশ ও দক্ষিণে হলো জহরবারু প্রদেশ আর ইপো হলো উভয় প্রদেশের মধ্যবর্তী স্থান।

যেসব পর্যটকরা অল্প খরচে সিঙ্গাপুর থেকে থাইল্যান্ড যেতে চায় তারা এই পথটি ব্যবহার করে। এই শহরের উত্তর দিকে রয়েছে সুদীর্ঘ দৃষ্টি নন্দন ট্যানেল, যা পার হতে প্রায় ৩০ মিনিট সময় লাগে। মালয়েশিয়ার অন্যান্য স্থানের মতো এখানেও প্রচুর পরিমাণে নারিকেল, ডুরোইন, রামবুথান ও স্ট্রবেরী ফলের চাষাবাদ হয়। । এলাকাটির নাম  “বান্দর বারু পোতরা” এখানে আসার পর ফজলুল করিম, ডাবলু, বাচ্চু, হাবিব ও আনোয়ারের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। প্রায় তিন দিন অবস্থান করার পর আলোককে সঙ্গে নিয়ে দুপুর দুইটার দিকে বাস যোগে কুয়লালামপুর শহরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি এবং সন্ধ্যা ছয়টায় কুয়ালালামপুর শহরে “পডুরাইয়া” কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে এসে পৌছি। অতঃপর অনেক খোঁজাখোঁজির পর রাত ১০ টায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু দেলোয়ার হোসেনের বাসার সন্ধ্যান পাই এবং তার বাড়ীতে আশ্রয় গ্রহণ করি। এলাকাটির নাম “পান্তাই ডালাম্ভ” পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। এখানে আসার পর শহিদ, তাজু, মোস্তফা, জাকির, সেতু, সবুজ, আব্দুল হক, পিযুষ, শাহিনুর ও লিটনের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়। তাদেরকে সাথে নিয়ে আমি কুয়ালালামপুরের ঐতিহাসিক ও দৃষ্টিনন্দন জায়গাগুলো ঘুড়ে ঘুড়ে দেখছি। এই সময় আমি শেলাঙ্গার প্রদেশের ‘শাহ্আলম’ এলাকায় মালয় সুগার মিলে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করেছি প্রায় দেড় মাস। এই এলাকাটি মালয়েশিয়ার সর্ববৃহৎ শিল্প নগরী।

কুয়ালালামপুর শহর কেলাং নদীর তীরে অবস্থিত। “কুয়ালা লামপুর” শব্দ দুটির অর্থ “কর্দমাক্ত জলাভুমি”। হয়াতো কোনো কালে এই অঞ্চলে কাদা ও জলের প্রাচুর্য ছিল। কিন্তু এখন আর তার কোন চিহ্ন নেই । এই জলাভুমির উপরই গড়ে উঠেছে সুন্দর শহর। এই শহরের মধ্যস্থালে রয়েছে মালয়েশিয়ার বৃহত্তম ‘পডুরাইয়া’ বাস টার্মিনাল। আন্ডারগ্রাউনসহ ৫ তলা বিশিষ্ট এই টার্মিনাল বেশ ব্যস্ত। বিভিন্ন প্রদেশে ১৫ মিনিট পরপর ৮/১০ টি যাত্রীবাহী বাস আসা-যাওয়া করে। এই টার্মিনালে দক্ষিণ পাশে রয়েছে “মেট্টোজায়া” আন্তঃশহর বাসষ্ট্যান্ড আর পশ্চিম পাশে কুয়ালালামপুর রেলওয়ে ষ্টেশন। এখানকার পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই চমৎকার।

কুয়ালালাম শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে সেলাঙ্গর শহরে বিখ্যাত ‘বাতুকেভস’ গুহা। কথিত আছে গুহাটি ৪ কোটি বছরের পুরানো। একদিন রবিবারে শহিদ ও পিযুষকে সঙ্গে নিয়ে সকাল ১০ টার দিকে বাতুকেভসে আসি। লোক সমাগম প্রচুর। প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক এবং তীর্থযাত্রী এই পর্যটন কেন্দ্রে ভিড় করে। ৩৭২ টি সিঁড়ি অতিক্রম করে মূল গুহা পর্যন্ত পৌছা যায়। মূল গুহার ভিতর রয়েছে দেবতা সুব্রানিয়াম বা মুরগানের মন্দির। এই গুহার চূড়ায় দাড়িয়ে পুরো সেলাঙ্গার শহর দেখা যায়। বাতুকেভস হলো দেবতা সুব্রনিয়ামের প্রতি উৎসর্গকৃত হিন্দু মঠ।  বাতুকেভস গুহা বাতু নদীর নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে বলে স্থানীয়র জানান । ভূমি থেকে এই গুহাটির উচ্চতা আনুমানিক ৫০০ ফুট হবে এবং গুহাটি সম্পূর্ণরূপে পাথরের। এই গুহার পাদদেশের সামনে বেশ খোলা জায়গা। আশপাশে রয়েছে কযেকটি ভারতীয় খাবার হোটেল। প্রতিদিন সকাল ৭ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত বাতুকেভস খোলা থাকে। অতঃপর দুপুরের খাবার খেয়ে আমরা বাস যোগে ছুটে চললাম শেলাাঙ্গর শহর থেকে ১৫/২০ মাইল পশ্চিম-দক্ষিনে “দারুল এহসান” নামক জায়গায়। এখানে রয়েছে বিখ্যাত “শেলাঙ্গ গলফ ক্লাব”। এই ক্লাবটি কুরমিটুলা গলফ ক্লাব থেকে প্রায় দেড় গুন বড় হবে। বন্ধু ডাবলু এখানে সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করে বিধায়, তার সুবাধে এলাকাটি ঘুড়ে দেখতে পেরেছি। সাধারনত বহিরাগতরা িএখানে প্রবেশ করতে পারে না।

দেলোয়ারের সহযোগীতায় বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মালয়েশিয়ান ইমিগ্রেশন অফিস থেকে প্রায় দেড় মাস পর ভিসাসহ ডুপ্লিকেট পাসপোর্ট আমার হস্তগত হয়। অতঃপর ফরিদা বিনতে বখতিয়ার ও আসাদুল্লা গালিভ নামক দুই মালয়েশিয়ানের সহযোগিতায় অনেক প্রচেষ্টার পর ‘ট্রেকভ্যালি ইন্টারন্যাশনাল’ নামক একটি বিখ্যাত সু-পিস কোম্পানিতে আমার চাকুরী হয়। এই এলাকাটির নাম “জানাল চেরাস”। অতি অল্প দিনের মধ্যে আমি কোম্পানির প্রায় সবগুলো কাজ রপ্ত করে ফেলি। প্রায় দেড় মাস পর ০১.০৯.১৯৯৩ সালে আমার পদোন্নতি ঘটে। বেতন নির্ধারিত হয় ১০০০ রিংগিট। থাকা-খাওয়া সম্পূর্ণ ফ্রি। শর্ত প্রতি ১২ মাস পর পর ১০০ রিংগিট করে বেতন বৃদ্ধি পাবে। কঠোর পরিশ্রম করে আমার পেশাগত দক্ষতা ক্রমান্বয়ে বাড়াতে থাকি। আস্তে আস্তে আমি ফ্যাক্টরীর মালিক শ্যামকাই লিও ও সিচুয়ান লিওর মধ্যমনি হয়ে উঠি। প্রায়ই তারা আমাকে বিভিন্ন ধরনের উপহার দিতেন, প্রীতিভোজ করাতেন ও বিভিন্ন জায়গায় ঘুড়তে নিয়ে যেতেন।

মালয়েশিয়ার কেলাঙ্গ সামুদ্রিক বন্দর থেকে পূর্ব-উত্তরে আনুমানিক ২৫০/৩০০ কিলোমিটার দূরে সাবা ও সারোয়াক প্রদেশ দু’টির অবস্থান। উভয় প্রদেশের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ইতিহাস অভিন্ন। মালয়েশিয়ার পূর্বাঞ্চলের এই প্রদেশ দু’টি বোর্নিও দ্বীপের অন্তর্গত। ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চলের শাসনকর্তা ছিল ব্রিটিশ লর্ড বোর্নিও কোম্পানী। আমাদের কোম্পানীর মালিক শ্যামকাই লিওর গ্রামের বাড়ী সাবা প্রদেশের রাজধানী কোটা কিনাবালু শহরে। এখানে তার বাবা-মা বাস করেন। এখানকার লোকেরা ডায়াক ভাষায় কথা বলে। ১৯৯৩ সালের নভেম্বরের শেষ রবিবার সকাল ৭ টার দিকে আমি ও বস শ্যামকাই লিওসহ কেলাঙ্গ সমুদ্র বন্দর থেকে একটি মাঝারি ধরনের লঞ্চে চড়ে সাবা প্রদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। প্রায় ৩ ঘণ্টা পর আমরা ‘কোটাকিনা বালু’ শহরে গিয়ে পৌছি। যথেষ্ট আধুনিক হলেও এই শহরটি সমুদ্র ও অরণ্য দিয়ে ঘেরা।

এই শহরের অতি নিকটে ‘তানজং আরু’ সমুদ্র সৈকত। সৈকতের নীল জলরাশি এবং আশপাশের নারিকেল গাছের বাগান , ঝাউ বনের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে ক্যানভাসের মতো। মনে হবে জয়নুল আবেদীনের মতো কোনো শিল্পী নিপুণ কারুশৈলীতে ছবি এঁকে গেছেন। এখান থেকে ১৫ মাইল দূরে রয়েছে ‘সিপিলোক’ ঘন অরণ্য। এই অরণ্যে ‘ওরাং-ওটান’ নামক বানর প্রজাতীর আদি প্রাণী বাস করে। পরের দিন সকাল ৮ টার দিকে আমরা পৌছে গেলাম সারোয়াক প্রদেশের রাজধানী কোচিং শহরে। এই অঞ্চলে ডায়াক উপজাতিদের বাস, যারা এক সময় ছিলেন নরমু- শিকারী। বিশ্বের সর্বাধিক গোলমরিচের চাষ এই অঞ্চলেই হয়। ‘সুইফট’ নামক চড়াই জাতীয় পাখী এখানে প্রচুর পাওয়া যায়। ঘুড়ি উড়ানো এখানকার জনপ্রিয় খেলা। সেলিবিস সাগরের তীরে অবস্থিত এই অঞ্চলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য খুব উপভোগ্য। এই সাগরটি মালয়েশিয়াকে দু’ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে।

কুয়ালামপুর শহর থেকে ৪/৫ মাইল দূরে অবস্থিত ‘আমপাং’ উপশহর। এখানে হাই ফুট প্রডাক্টস নামক একটি সামুদ্রিক মাছ পক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানীতে আমার ছোট চাচার ছেলে সাব্বির আহমেদ খান আকিল চাকুরী করতো। আমি মাঝে-মধ্যে তার বাসায় বেড়াতে যেতাম। এখানে আকিলের কলিগ মিন্টু, মাহবুব, ওয়াজেদ, আলমগীর, জসিম ও ওয়াদুদের সাথে আমার পরিচয় হয়। বিশ্ববিখ্যাত কনকর্ড হোটেল, নিউ ওয়ার্ল্ড হোটেল, লিজে- হোটেল, ক্রাউন্ড হোটেল এই শহরে অবস্থিত। এই শহরেই অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। আর এই এলাকাই নিমার্ণ হচ্ছে বিশ্ব বিখ্যাত ‘পেট্রোনাস টাওয়ার’। এছাড়াও এখানে রয়েছে মালয়েশিয়ার বৃহত্তম ‘ষ্টারকেটিভি’ রেলওয়ে স্টেশন। এখানে শুধু বিভিন্ন প্রদেশের দূরপাল্লাগামী ট্রেন চলাচল করে। প্রতি ২০ মিনিট পর পর ৮/১০ টি ট্রেন বিভিন্ন প্রদেশে আসা-যাওয়া করে। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা পর্যটকদের পদচারণায় এলাকাটি মুখরীত থাকে।

কুয়ালালামপুর শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরত্বে গ্যান্টিং হাইল্যান্ডের অবস্থান। ভূমি থেকে পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ছয় হাজার ফুট। পাহাড়ের চূড়ায় উঠার জন্যে ক্যাবর-কার রয়েছে। ১৯৯৪ সালের জানুয়ারীর প্রথম রবিবার প্রাতরাশ করে সকাল ৬ টায় আমি, আকিল, মিন্টু, রমজান ও জোহরসহ আকিলদের কোম্পানীর বাসে চড়ে গ্যান্টিং হাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি এবং সকাল ৮ টায় উক্ত পাথরের পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছি। পাদদেশের বিশাল এলাকা জুড়ে রয়েছে একটি স্ট্রবেরী ফলের বাগান। বাগানের প্রবেশ মূন্য এক রিংগিট। দৈনিক হাজার হাজার পর্যটক এই বাগানে ঘুড়তে আসেন। গাছ থেকে স্ট্রবেরী তুলে অনেকেই খান। প্রায় আধা ঘণ্টা ঘুড়াঘুড়ির পর আমরা বাসে করে প্রায় ১২০ মিনিটের মধ্যে ক্যাবল কার স্টেশনে পৌছি। তারপর ক্যাবল-কারে চেপে পাহাড়ের চূড়ায় উঠি।

ভূমি থেকে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লেগে যায়। উপরে উঠার পর চারদিকে তাকালে ভয় পায় অনেকেই। এখানে মেঘমালাকে হাতের নাগালে পাওয়া যায়। হঠাৎ মেঘের কণাগুলো এসে সমস্ত শরীর ভিজিয়ে দেয়। এইখানে সারা বছরই ঠান্ডা থাকে। এই পাহাড়ের চূড়াকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘লাসভেগাসের’ আদলে নিমার্ণ করা হয়েছে। এখানে রয়েছে সবুজপার্ক, ডিজনি ওয়ার্ল্ড, সুইমিংপুল, ক্যাসিনো হল, নাইট ক্লাব, পাঁচতার হোটেল, গানিকালয়, শপিংমল ইত্যাদি। সমাজের বিত্তশালীরা চিত্তবিনোদনের জন্যে এখানে আসে। বিকাল ৫ টা থেকে ভোর ৬ টা পর্যন্ত এ শহর জেগে থাকে আর দিনের বেলায় থাকে সুমসাম নিরবতা।

কুয়ালালামপুর শহর থেকে ২/৩ মাইল অভ্যন্তরে চৌমোহনায় চকেট এভিনিউ অবস্থিত। প্রতিদিনই বাংলাদেশীদের হাট বসে এই এলাকায়। এই এলাকায় রয়েছে ৭/৮ টি বাঙ্গালী রেস্টুরেন্ট। বাঙ্গালী খাবার খাওয়ার জন্যে মাঝে মধ্যে আমি এই এলাকায় আসতাম। এই এলাকাটি দেখতে অনেকটা আমাদের দেশের গুলশান অভিজাত এলাকার মতো। এখানে রয়েছে বেশ কয়েকটি বিখ্যাত শপিং মল, আবাসিক হোটেল, কফি হাউজ ও ফাস্ট ফুডের দোকান। মাঝে মধ্যে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা যায়, এই এলাকায় বিভিন্ন ধরনের নাটক ও সিনেমার সুটিং হয়ে থাকে। এলাকাটি পর্যটকদের জন্যে একটি আকষর্ণীয় স্থান।

মালয়েশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে মালাক্কা প্রদেশ অবস্থিত। এখানে জাভা সাগর ও বঙ্গোপসাগর মিলিত হয়ে মালয় সাগর নাম ধারন করেছে। প্রকৃতিগতভাবে সুমাত্রাদ্বীপ ও মালাক্কা দ্বীপের মধ্যবর্তী স্থানে বিশালতর খাল তৈরী হয়েছে, যার নাম মালাক্কা প্রণালী। ১৫ শতকে মুসলিম ব্যবসায়ীরা এই প্রণালী দিয়ে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য করতো। ইবনে বতুতার সফরনামায় এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এই প্রণালীর উভয় দ্বীপের নৈসর্গিক সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হয়ে কবি জীবনান্দদাশ তার বিখ্যাত “বনলতা সেন” কবিতাটি লিখে ছিলেন। চায়না নববর্ষ উপলক্ষে ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে আমি, আলোক, হাবিব, বাচ্চু, বাতেন ও ডাবলু কুয়ালালামপুরের পডুরাইয়া বাস টার্মিনাল থেকে রাত ১২ টার দিকে বাসে চড়ে মালাক্কা প্রদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি এবং সকাল ৬ টায় মালাক্কা পুরানো সমুদ্র বন্দরে গিয়ে পৌছি। অতঃপর সকালের নাস্তা সম্পন্ন করে আমরা মালাক্কার ঐতিহাসিক স্থানগুলো ঘুড়ে ঘুড়ে দেখতে লাগলাম। এখানে রয়েছে পর্তুগীজ রাজপ্রসাদ, পুরানো আমলের ঘোড়া দৌড় ময়দান, সমুদ্রগামী কাঠের তৈরী জাহাজ, পুরানো আমলের তৈরী গরুর গাড়ীর মূর্তি ও কয়েকজন মুসলিম ধর্ম প্রচারকদের কবর। কবরের সামনে রয়েছে বিশাল দান বাক্স। প্রবাদ আছে, যেই ব্যক্তি এই দান বাক্সে যত পরিমাণ টাকা দান করবেন পরকালে সেই ব্যক্তি তার দ্বিগগুণ পূন্য পাবে।

মালাক্কা ভ্রমণ সমাপ্ত করে আমরা বাসযোগে সকাল ১০ টার মধ্যে ‘নিগরী সিম্ভীনাল’ প্রদেশে এসে পৌছলাম। প্রথমেই আমরা দেখতে পেলাম দেড়শত ফুট উঁচু মাটির ডিভির উপর বসা গৌতম বুদ্ধের বিশালাকার পাথরের মূর্তি। কথিত আছে মূর্তিটি এক হাজার বছরের পুরানো। মূর্তিটির উচ্চতা হবে আনুমানিক ৬০ ফুট। মূর্তিটির সামনেই বেশ খোলা জায়গা। আশেপাশে রয়েছে বিভিন্ন ভঙ্গিতে দাঁড়ানো গৌতম বুদ্ধের বেশ কয়েকটি মূর্তি। বিভিন্ন ধরনের ফুল ও ক্যকটাসের বাগান এবং কৃত্রিম ঝর্ণা। আরো রয়েছে বিরাট গর্তের ভিতর অনেকগুলো বিশাল আকৃতির জীবন্ত কুমির এবং ঐ গর্তের উপর ঝুলন্ত সেতু। কেউ ঝুলন্ত সেতু থেকে গর্তের মধ্যে পড়ে গেলে নিশ্চিত কুমিরের পেটে। এছাড়াও রয়েছে রূপকথার আলাদীনের চেড়াগের দৈত্যের অন্ধকার কৃত্রিম প্রসাদ।

এখানকার ভ্রমন আপাতত শেষ হওয়ার পরসবাই দুপুরের খাবার সম্পন্ন করে কুয়ালালামপুরের সবচেয়ে নিকটবর্তী সমুদ্র সৈকত ‘পোর্ট ডিকসন’ এর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম এবং বিকাল ৫ টার মধ্যে উক্ত স্থানে এসে পৌছালাম। চায়নিজ নববর্ষ উপলক্ষ্যে আবাসিক হোটেল গুলোতে প্রচন্ড ভিড়, কোন রুম খালি নেই। তখন আমাদের সবার কাঁদো কাঁদো মুখ। অবশেষে আল্লাহর রহমতে একটি মাঝারি মানের কটেজে ২০ রিংগিটের ভাড়ায় দু’টি রুম পেলাম। অতঃপর পোষাক পরিবর্তন করে সমুদ্রের নোনা জলে নামলাম। স্নানরত অবস্থায় সূর্য্য ডুবার দৃশ্য সত্যিই উপভোগ্য । এখানে ভাড়ায় স্পিডবোটে সমুদ্র ঘুড়া যায়। এখানে বেশির ভাগই বিদেশী। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বেশি দেখলাম বিদেশীর মধ্যে। আর রয়েছে অসংখ্য বিদেশী শিশু। ভারি সুন্দর দেখতে লাগছে তাদের । গোটা চত্বরে হুড়োহুড়ি করে বেড়াচ্ছে তারা। বড়দের মধ্যে কেউ কেউ ভলিবল খেলছেন, কেউ বসে গল্প করছেন, কেউ সাফারি করছেন, কেউ লাইফ জ্যাকেট পরে সাঁতার কাটছেন, কেউ স্নান করছেন।

প্রায় ঘণ্টাখানেক সমুদ্রের নোনা জলে দাপদাপি করার পর আমরা ডাঙ্গায় উঠলাম। সমুদ্রের ধারে ঝাউ গাছের সারি। আরো রকমারী ফুল গাছের সমাহার। রাতের খাবার সম্পন্ন করে রাত দ্বিপ্রহর পর্যন্ত ঝাউ গাছের নিচে বসে দল বেঁধে আড্ডা দিলাম। প্রতিটি হোটেল ও কটেজগুলোতে রয়েছে ক্যাসিনো হল, ওয়াইন শপ, কফি হাউজ ও খাবার হোটেল। পরের দিন সকালের নাস্তা সমাপ্ত করে সকাল ৮ টার দিকে কুয়ালালামপুর জাতীয় চিড়িয়াখানার উদ্দেশ্যে বাসে চড়লাম এবং সকাল ১০ টার ‘জোনিগারা’ অর্থাৎ জাতীয় খানার ফটের কাছে পৌছলাম। ৩ রিংগিট চিড়িয়াখানার প্রবেশ মূল্য। চায়নিজ নববর্ষ কারণে এখান প্রচন্ড ভিড়। চিড়িয়াখানাটি আমাদের ঢাকার চিড়িয়াখানা অপেক্ষা দেড়গুণ বড় হবে। পুরো এলাকাটি ঘুড়তে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লাগে। এখানে রয়েছে ওরাং-ওটাং, বেবুন, সজারু, ভলগা হরিণ, চিতাবাঘ, ভাল্লুক, জিরাফ, উটপাখী,গন্ডার, জলহস্তি, হাতি, ইয়াক, হনুমান, শিম্পাঞ্জি, ইমু, পান্ডা, শকুন, বিভিন্ন ধরণের বিষধর সাপ, ডলফিন ইত্যাদি প্রাণী। এককথায় পৃথিবীর সব ধরনের দুর্লভ প্রাণী এখানে আছে। প্রতিদিন সকাল ৮ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত ‘জোনিগারা’ খোলা থাকে।

চায়নিজ নিউ ইয়ারের ছুটি শেষ হওয়ার পর আমরা এই ভ্রমন সমাপ্ত করে যার যার বাসায় প্রত্যাগমন করি এবং ০১.০৩.১৯৯৪ সালে নববর্ষের নব উদ্দীপনা নিয়ে আমি ফ্যাক্টরির কাজে যোগদান করি। কিন্তু সুখ আমার দীর্ঘস্থায়ী হলো না। ০২.০৩.১৯৯৪ সালে রাত্রি ১০ টার দিকে হঠাৎ আমার বড় ভাই মোঃ শামসুল আবরার খান ফোন করে জানায় যে, “গত ০৪.০২.১৯৯৪ সালে সকাল ৭ টার দিকে আব্বা হার্ট এ্যাটাকে ইন্তেকাল করেছেন। পারিবারিক বৃহৎ স্বার্থে তুমি অতি দ্রুত দেশে প্রত্যাবর্তন কর”। এই দুঃসংবাদটি শোনার পর আমি হতোদ্যম হয়ে পরি। অতঃপর অনেক ভেবেচিন্তে পারিবারিক স্বার্থে নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে বিসর্জন দিয়ে ০৬.০৩.১৯৯৪ সালে মর্মপীড়া নিয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাগমন করি। দেশে এসে আমি একটি সুন্দর সেবামূলক কাজের সন্ধান করতে থাকি। অবশেষে ব্রা‏হ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতাল রোডস্থ মহিলা কলেজ মার্কেট ১৩.১০.১৯৯৪ ঔষধের ব্যবসা শুরু করি। বর্তমানে আমি জীবন সায়াহ্নে উপনিত এবং দু’সন্তানের জনক। আজও মালয়েশিয়ার সু -মধুর ভাষা, সমুদ্র সৈকত, ভূ-প্রকৃতি, ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান, বিভিন্ন ধর্ম অনুসারীদের ভিন্ন ভিন্ন   সাংস্কৃতি ও  ঐতিহ্য এবং  মালয়েশিয়ানদের অভিন্ন জাতীয়তাবাদী চেতনাবোধ আমাকে আকৃষ্ট করে। সুতরাং সময়-সুযোগ পেলে আবারও আমি সপরিবারে মায়াবী মালয়েশিয়ায় বেড়াতে যাব।

খায়রুল আকরাম খান : ব্যুরো চীফ, দেশ দর্শন

Some text

ক্যাটাগরি: আত্মজীবনী

[sharethis-inline-buttons]

Leave a Reply

আমি প্রবাসী অ্যাপস দিয়ে ভ্যাকসিন…

লঞ্চে যৌন হয়রানি